চন্দ্রনাথ রথ খুন: ভিনরাজ্যের শার্প শুটার তত্ত্বে জোর, তদন্তে নামল সিট ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা

শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহকারী চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় তদন্ত ক্রমশই আরও জটিল দিকে এগোচ্ছে। বুধবার গভীর রাতে তাঁকে গুলি করে খুন করার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বারাসত হাসপাতালে শুরু হয়েছে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি। ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করেছে রাজ্য প্রশাসন। এসটিএফ, সিআইডি এবং আইবি-র আধিকারিকদের নিয়ে তৈরি এই দল এখন খতিয়ে দেখছে খুনের নেপথ্যে থাকা সম্ভাব্য চক্রকে।

তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, এই খুনে পেশাদার শার্প শুটার ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এমনও সন্দেহ করা হচ্ছে, আততায়ীরা ভিনরাজ্য থেকে এসেছিল। সেই সূত্র ধরেই সিআইডির একটি বিশেষ দল অন্য রাজ্যে রওনা দিয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজও খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, ঘটনার পর আততায়ীরা বিমানে করেই পালিয়ে যেতে পারে।

ঘটনাস্থলে বৃহস্পতিবার সকালেই পৌঁছয় সিআইডির আধিকারিকেরা। ফরেনসিক দলও নমুনা সংগ্রহ করেছে। চন্দ্রনাথ যে গাড়িতে ছিলেন, সেই গাড়ির সামনের দু’টি আসনে রক্তের দাগ মিলেছে। গাড়ির বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চন্দ্রনাথ রথের উপর নজর রাখা হচ্ছিল। তাঁর যাতায়াত, রুটিন, কোথায় কখন যাচ্ছেন, সব কিছুই নাকি লক্ষ্য করছিল আততায়ীরা। কলকাতা পুলিশ এলাকার যেসব রাস্তা দিয়ে তাঁর গাড়ি গিয়েছে, সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যেই তিন জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ।

যে গাড়িটি হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল, তার নম্বর প্লেট ভুয়ো বলে জানা গিয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, ওই নম্বরের আসল গাড়িটি রয়েছে শিলিগুড়িতে। গাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন তদন্তকারীরা। তিনি জানিয়েছেন, গাড়িটি বিক্রির জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। পুলিশের অনুমান, সেখান থেকেই নম্বর সংগ্রহ করে সেটি নকলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

ঘটনার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে বৃহস্পতিবার সকালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজে ফোন করে শুভেন্দু অধিকারীর কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য নিয়েছেন।

এদিকে, বিএসএফের ডিজি প্রবীণ কুমারও বৃহস্পতিবার সকালে মধ্যমগ্রামের ঘটনাস্থলে যান। রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্ত বুধবার রাতেই হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন। যদিও তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ্যে খুব বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি। তবে জানিয়েছেন, ঘটনায় ব্যবহৃত একটি চারচাকা গাড়ি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সেখান থেকে কিছু গুলি ও ব্যবহৃত কার্তুজও উদ্ধার হয়েছে।

ঘটনার পর থেকেই গোটা এলাকা কার্যত নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে। যেখানে চন্দ্রনাথকে গুলি করা হয়, সেই এলাকা ঘিরে রেখেছে পুলিশ। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরাও মোতায়েন রয়েছেন। চন্দ্রনাথ যে আবাসনে থাকতেন, সেখান থেকে যশোর রোড পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় কড়া নজরদারি চলছে। আপাতত ওই রাস্তায় যান চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও কিছু বিধিনিষেধ জারি রয়েছে।

বৃহস্পতিবার ভোরে চন্দ্রনাথ রথের দেহ মধ্যমগ্রাম হাসপাতাল থেকে বারাসত মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়। সেখানেই হবে ময়নাতদন্ত। মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে খবর, তিন সদস্যের একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। একজন বিভাগীয় প্রধান এবং দু’জন সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন সেই দলে। গোটা প্রক্রিয়াকেই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এলেই দ্রুত ময়নাতদন্ত শুরু হবে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও বারাসত হাসপাতালে যাওয়ার কথা রয়েছে। রাজনৈতিক মহলেও এই খুনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

 ছবি: সংগৃহীত