যুদ্ধবিরতির আড়ালে নতুন সমীকরণ: ইরান-আমেরিকা সংঘাতে কে সত্যিই পিছু হটল?

ইরান আর যুক্তরাষ্ট্র, দু’পক্ষই এখন নিজেদের জয়ী হিসেবে তুলে ধরছে। প্রকাশ্যে কেউই একচুল নরম হওয়ার কথা মানতে চাইছে না। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘ উত্তেজনা, হামলা আর পাল্টা হুমকির পর শেষ পর্যন্ত দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। আর সেই সিদ্ধান্তই এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—আসলে কি দুই পক্ষই নিজেদের আগের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে?

গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় অন্তত ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই আটকে থাকেনি, ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের ট্যাঙ্কার আটকে যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ ঘোষণা করেন, ইরানের কাছ থেকে ১০ দফার একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাওয়ার পর আপাতত বোমা হামলা বন্ধ রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। নিজের সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, বহু অমীমাংসিত বিষয়েই নাকি দুই পক্ষের মধ্যে এখন ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা আমাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছি, বরং প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছি।”

ট্রাম্প এটিকে নিজের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই তুলে ধরছেন। কারণ, এতদিনের চাপ, হুমকি আর সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পর শেষ পর্যন্ত ইরান আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, শুধু আলোচনায় বসাই শেষ কথা নয়। ভবিষ্যতে ট্রাম্পকে দেখাতে হবে, এই চাপ প্রয়োগের বদলে তিনি ইরানের কাছ থেকে আদৌ কী আদায় করতে পারলেন।

অন্যদিকে, ইরানও নিজেদের অবস্থানকে দুর্বল হিসেবে দেখাতে চাইছে না। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, হামলা বন্ধ থাকলে তারাও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ স্থগিত রাখবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলেও আর বাধা দেবে না তেহরান।

কিন্তু ইরানের ভেতরে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। অনেকের অভিযোগ, সরকার শেষ পর্যন্ত আমেরিকার চাপের কাছেই নতি স্বীকার করেছে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস এখন চরমে। কারণ, অতীত অভিজ্ঞতা তাদের মনে এখনও তাজা।

ইরানি মহলের ক্ষোভের বড় কারণ, আলোচনা চলাকালীন সময়েই একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলা এবং ফেব্রুয়ারির সাম্প্রতিক হামলা—দু’বারই কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল। ফলে তেহরানের একটা বড় অংশ মনে করছে, ওয়াশিংটনের কথায় ভরসা করার সুযোগ খুব কম।

এখন শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে আবারও আলোচনায় বসতে পারে দুই দেশ। কিন্তু সমস্যা হলো, যেসব বিষয়ে এতদিন কেউই আপস করতে রাজি ছিল না, সেগুলো এখনও পুরোপুরি মেটেনি। বরং যুদ্ধবিরতির চাপা শান্তির নিচে সেই পুরনো মতভেদগুলো থেকেই গেছে।

সেই কারণেই বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, আপাতত সংঘাত থামলেও পরিস্থিতি এখনও ভঙ্গুর। প্রকাশ্যে যতই জয়ের দাবি করা হোক না কেন, বাস্তবে দুই পক্ষই হয়তো বুঝতে পেরেছে—এই লড়াই দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতি সবারই।

 ছবি: সংগৃহীত