পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে একেবারে ২৯৪টি আসনের পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে দিল তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) কালীঘাটের বাড়িতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তালিকা প্রকাশ করেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পরদিনই বিজেপি ও সিপিএম প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা দিয়েছিল। তার পরদিনই সব আসনের প্রার্থী একসঙ্গে জানিয়ে দিল তৃণমূল। প্রত্যাশামতোই ভবানীপুর থেকেই লড়বেন মমতা। দার্জিলিংয়ের তিনটি আসন জোটসঙ্গী অনিত থাপার দল বিজিপিএমকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এবারের তালিকায় আগের মতোই নারী, সংখ্যালঘু, অনগ্রসর শ্রেণি এবং নতুন-পুরনো মুখের মিশ্রণে জোর দেওয়া হয়েছে। তালিকায় চমকও কম নেই। টলিউডের অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রাক্তন ক্রিকেটার থেকে শুরু করে সাবেক আমলারা—অনেকেই জায়গা পেয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ভবানীপুরে মমতা নিজে, নন্দীগ্রামে পবিত্র কর, শিলিগুড়িতে গৌতম দেব, দিনহাটায় উদয়ন গুহ, জঙ্গিপুরে জাকির হোসেন, ডোমকলে হুমায়ুন কবীর, তুফানগঞ্জে প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল, ব্যারাকপুরে রাজ চক্রবর্তী, কামারহাটিতে মদন মিত্র, বরানগরে সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দমদমে ব্রাত্য বসু, কলকাতা বন্দর এলাকায় ফিরহাদ হাকিম—এভাবে একাধিক পরিচিত নাম রয়েছে তালিকায়।
তবে বাদও পড়েছেন কয়েকজন পুরনো বিধায়ক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বা অভিনেতা-রাজনীতিক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী।
তালিকা প্রকাশের পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম। এই দুই আসনেই বিজেপি শুভেন্দু অধিকারীকে প্রার্থী করেছে। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভবানীপুরে সরাসরি লড়াইয়ে নামার বার্তা দিলেন মমতা। ফলে ২০২১-এর নন্দীগ্রামের পর আবারও মুখোমুখি হতে চলেছেন এই দুই নেতা।
সাংবাদিক বৈঠকেই মমতা নির্বাচনী স্লোগানও ঠিক করে দেন—২০২৬-এর ভোটে ২২৬-এর বেশি আসন জয়ের লক্ষ্য। ভবানীপুরে জয়ের ব্যাপারেও তিনি আত্মবিশ্বাসী, বলেন, “অনেক ভোটে জিতব।”
২০২১ সালের ভোটের প্রসঙ্গ টেনে অনেকে বলছেন, নন্দীগ্রামে হারের পর ভবানীপুর থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন মমতা। এবার সেই ভবানীপুরেই শুভেন্দুর প্রার্থী হওয়ায় লড়াইটা আরও জমে উঠবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এদিকে তালিকা ঘোষণার আগেই ভবানীপুরে দেওয়াল লিখন শুরু করে দিয়েছে দুই পক্ষই। বিজেপি আগেই নেমে পড়েছিল, পিছিয়ে থাকতে চায়নি তৃণমূলও।
সাংবাদিক সম্মেলনে মমতার সঙ্গে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, এবার ৫২ জন মহিলা প্রার্থীকে টিকিট দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু প্রার্থীও বেড়ে হয়েছে ৪৭ জন। বয়সের দিক থেকেও ভারসাম্য রাখা হয়েছে—তরুণ থেকে প্রবীণ, সব স্তরের প্রার্থীই রয়েছেন তালিকায়।
সংরক্ষিত আসন ৮৪টি হলেও তৃণমূল এবার ৯৫ জন তফসিলি জাতি-উপজাতির প্রার্থী দিয়েছে বলে জানান অভিষেক। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, অনগ্রসর ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার লক্ষ্যেই এই কৌশল।
বিজেপিকে আক্রমণ করে মমতা বলেন, “এত ভয় পাচ্ছেন কেন? রাজনৈতিক লড়াই করুন।” প্রশাসনিক বদলি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি, বিশেষ করে ঈদের আগে কর্মকর্তাদের সরানো নিয়ে।
সীমান্ত ইস্যুতেও কড়া সুরে বলেন, বাইরে থেকে লোক ঢুকিয়ে অশান্তি হলে তার দায় বিজেপিকেই নিতে হবে।
এবার রাজ্যে দুই দফায় ভোট হবে—২৩ এপ্রিল ১৫২টি আসনে, ২৯ এপ্রিল বাকি ১৪২টিতে। গণনা ৪ মে। ইতিমধ্যেই কয়েকশো কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়েছে, আরও আসবে।
ভোটার তালিকা যাচাই নিয়েও জোরকদমে কাজ চলছে। লক্ষাধিক ভোটারের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে প্রতিদিন। যদিও বিজেপি ও সিপিএমের দাবি, এই প্রক্রিয়া শেষ না করে ভোটে যাওয়া ঠিক হবে না।

Social Plugin