নতুন যুদ্ধের বাস্তবতা: হাইপারসনিক হুমকির সামনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোথায় দাঁড়িয়ে

ওয়াশিংটনে সাম্প্রতিক এক শুনানিতে এমন একটা কথা সামনে এসেছে, যা বেশ অস্বস্তিকর—যুক্তরাষ্ট্র এখনও হাইপারসনিক অস্ত্র বা উন্নত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর মতো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। পেন্টাগনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নিজেই এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন।

মহাকাশ নীতি নিয়ে কাজ করা সহকারী যুদ্ধসচিব মার্ক বারকোভিটস সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির সামনে বলছিলেন, এখনকার হুমকিগুলো আগের মতো নয়। রাশিয়া, চীন—এমনকি অন্য দেশগুলিও এমন অস্ত্র তৈরি করছে, যেগুলো প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বাইরে। এই নতুন ধরনের অস্ত্র, বিশেষ করে হাইপারসনিক আর দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডকে লক্ষ্য করেই বানানো।

তিনি পরিষ্কার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের সীমিত আক্রমণ ঠেকানোর কথা মাথায় রেখেই তৈরি হয়েছিল। সেটাও একধরনের একস্তরবিশিষ্ট, ভূভিত্তিক ব্যবস্থা। কিন্তু বড় আকারের বা আধুনিক হামলার ক্ষেত্রে সেই সক্ষমতা খুবই সীমিত। আর হাইপারসনিক বা উন্নত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে তো কার্যত কোনো প্রতিরোধই নেই।

এই স্বীকারোক্তি এমন সময় এল, যখন বিশ্বজুড়ে সামরিক প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোর অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছেই। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকেও নিজের ঘাটতি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটেই সামনে এসেছে ‘গোল্ডেন ডোম’ নামের একটি বড়সড় প্রকল্প। লক্ষ্য একটাই—পুরো দেশকে ঘিরে এমন এক প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করা, যা আকাশপথে আসা প্রায় সব ধরনের হুমকি সামলাতে পারবে। স্থল, জল, আকাশ, এমনকি মহাকাশ—সব জায়গার তথ্য একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা। এর সঙ্গে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সেন্সর আর প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র।

তবে এই পরিকল্পনা যতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী, খরচও ততটাই বিশাল—প্রায় ১৭৫ থেকে ১৮৫ বিলিয়ন ডলারের মতো। লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০২৮ সালের মধ্যে এটাকে পুরোপুরি কার্যকর করা, যদিও পুরো প্রকল্পের ব্যয় ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত ধাপে ধাপে যাবে।

শুনানিতে আরও একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—শুধু প্রযুক্তি থাকলেই হবে না, সেটাকে ধরে রাখার মতো শিল্পভিত্তিও দরকার। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রধান হিথ কলিন্স জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় উৎপাদন আর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে। ফলে দ্রুত বড় আকারে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা সহজ হবে না।

আইনপ্রণেতারাও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত। সাম্প্রতিক সংঘাত—যেমন ইউক্রেন যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি—দেখিয়েছে, বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একসঙ্গে এলে অনেক শক্তিশালী প্রতিরক্ষাও চাপে পড়ে যায়। তাই শুধু প্রযুক্তি নয়, দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও জরুরি।

খরচ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এত বড় প্রকল্প কীভাবে অর্থায়ন করা হবে, সেই নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে অর্থ জোগাড় করা হলে কংগ্রেসের নজরদারি কমে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার—শীতল যুদ্ধের সময়ের সেই সরল সমীকরণ এখন আর নেই। একাধিক পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, তার সঙ্গে দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেক জটিল। এই বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা আর প্রতিরোধ—দুটোই সমান জরুরি। বারকোভিটসের কথায়, শুধু আক্রমণ ঠেকানো নয়, প্রয়োজনে নাগরিকদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে—অর্থাৎ হাতে থাকতে হবে তরবারি, সঙ্গে ঢালও।