ভবানীপুরে মমতা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, সমীক্ষা কি জানাচ্ছে


 আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এবার খবরের কেন্দ্রবিন্দুতে ভবানীপুর বিধানসভা। এখানে মুখোমুখি হচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী। মিডিয়া ও সমাজমাধ্যমের অন্যতম আকর্ষণ এই কেন্দ্র। ভবানীপুর বিধানসভা নিয়ে দু-চার কথা বলি। অনেকে বলেন ভবানীপুর বিধানসভা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাস তালুক। দেখা যাক কথাটার কতটা সারসত্য আচ্ছে। আসলে স্বাধীনতার পরের থেকে এই কেন্দ্রটিতে কংগ্রেসীদের দাপট। একসময় এখান থেকে জিততেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। এই কেন্দ্র থেকেই কংগ্রেসের টিকিটে বিধায়ক হয়েছেন মীরা দত্তগুপ্ত, রথিন তালুকদাররা। ১৯৭৭ সালে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন সিপিএমের অশোক মিত্র। পরবর্তী তিনটি বিধানসভা নির্বাচনেও জয়ী হন সিপিএমের অশোক মিত্র। এরপর প্রথম পরিবর্তন আসে ১৯৯৬ সালে। সেবার কংগ্রেসের টিকিটে জয়ী হন সুব্রত বক্সী। পরবর্তী নির্বাচনে সুব্রত বক্সী জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে।
২০১১ সালে যখন রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া, সেসময় দক্ষিণ কলকাতার ওই কেন্দ্রেটিতে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন তৃণমূলের বর্তমান রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সি। সেবার ৬৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয় হয়ে ৩৭ হাজার ৯৬৭ ভোট পান সিপিএমের নারায়ণ জৈন। বিজেপি প্রার্থী সেবার পান ৫ হাজার ভোট। প্রায় ৫০ হাজার ভোটে জেতেন বক্সি। রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেই উপনির্বাচনে জেতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় । জয়ের ব্যবধান ছিল ৫৪ হাজার। সেবার বিজেপি ওই কেন্দ্রে প্রার্থী দেয়নি।
পাঁচ বছর বাদে ১৯১৬ সালে ফের মমতাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে চেয়েছিল বিরোধী শিবির। সেবার রাজ্যে প্রথম বাম-কংগ্রেস জোট হয়। তখনও বঙ্গে বিজেপির এভাবে উত্থান হয়নি। এবার মমতার বিরুদ্ধে জোটের তরফে প্রার্থী করা হয় কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী দীপা দাশমুন্সীকে। 'দিদি' বনাম বৌদি এই প্রচারও করা হয়। বাম ও কংগ্রেস জোট রীতিমতো মমতাকে নিজের কেন্দ্রে বেঁধে ফেলার ছক কষেছিল। প্রচারেও কোনও খামতি রাখা হয়নি। কিন্তু ভোটের ফল প্রকাশের পর দেখা গেল মমতাকে জিততে কোনওরকম বেগই পেতে হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পান ৯৬ হাজারের মতো ভোট।  দীপা দাশমুন্সী পান ৪০ হাজার ২১৯ ভোট। সেবার বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে নামিয়েছিল নেতাজি পরিবারের সদস্য চন্দ্রকুমার বোসকে। তিনি পান ৫৬ হাজারের কিছু বেশি ভোট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেতেন ৪০ হাজারের কিছু বেশি ভোটে। সেবারও বিজেপি ভেবে ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরাজিত হবেন।
২০২১-এ প্রচুর ক্যাম্পেইন, প্রচুর খরচ করে বিজেপি মমতার বিরুদ্ধে  ২৪% ভোট পায়, কিন্তু গত পাঁচ বছরে সেই চিত্র প্রচুর বদলে গেছে, গতবার খোলা নব্য বিজেপির কার্যালয় লোকের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যারা গতবার বিজেপি করত, এবং এইবারও বিজেপি কে ভোট দেবে এই কথা হলফ করে বলা যায় না।
কলকাতা পুরসভার ৬৩, ৭৭, ৭৪, ৭১, ৭০, ৭২, ৭৩, ৮২ ওয়ার্ড নিয়ে তৈরি ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র। ভবানীপুরের ভোটিং ম্যাপ বলছে, ৪২ শতাংশ বাঙালি হিন্দু, ২৪ শতাংশ মুসলিম ও ৩৪ শতাংশ অবাঙালি হিন্দু। অর্থাত্‍ শুধু হিন্দু ভোট ধরলে, ৭৬ শতাংশ হিন্দু ভোট। মুসলমান ভোটার অনেকটাই কম। শুভেন্দু অধিকারী সেই অঙ্কেই এই কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর আশা, পুরোপুরি ধর্মীয় বিভাজনের মাধ্যমে এই কেন্দ্রে পদ্ম ফোটাবেন। তার পাশাপাশি এসআইআর তাকে ভরসা জুগিয়েছে।  চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে দেখা যাচ্ছে মাত্র ২৪ শতাংশ মুসলিম ভোটারের কেন্দ্র ভবানীপুরে বিবেচনাধীনের তালিকা বেশ লম্বা। দেখা যাচ্ছে, ওই কেন্দ্রের বিবেচনাধীন তালিকার ৫৬ শতাংশই মুসলিম ভোটার। তাছাড়া ছোট্ট ওই কেন্দ্রে বাদও গিয়েছেন প্রায় ৪৫ হাজার ভোটার। বলা বাহুল্য ওই ভোটারদের মধ্যে একটা বড় অংশ সংখ্যালঘু।  বিজেপি পুরোপুরি ধর্মীয় বিভাজনের ওপর নির্ভর করে বসে৷ আছে। ভবানীপুর কেন্দ্রটি বরাবর কংগ্রেসীদের প্রাধান্য। পরে যা তৃণমূলে গিয়েছে। এই কেন্দ্রে আশানুরূপ ধর্মীয় বিভাজন সেভাবে কাজ করে না। এই কেন্দ্রে বহু ভোটার মধ্যবিত্ত বাঙালি। তারা আর যা-ই হোক বিজেপিকে কোনওকালে সমর্থন করেননি।