ওয়াল স্ট্রিটে ঝড়: সাফল্যের চূড়ায় থাকা লরনাকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

ওয়াল স্ট্রিটের চেনা, প্রতিষ্ঠিত মুখ লরনা হাজ়দিনি—দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে জেপি মরগ্যানের মতো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, আজ তিনি অন্য এক কারণে আলোচনায়। ৩৭ বছর বয়সি এই কর্পোরেট কর্তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন তাঁরই সংস্থার প্রাক্তন কর্মী চিরায়ু রাণা।

চিরায়ুর অভিযোগের তালিকা ছোট নয়—যৌন নিপীড়ন থেকে শুরু করে প্রভাব খাটানো, মাদক ব্যবহার, এমনকি বর্ণবিদ্বেষী আচরণও রয়েছে তাতে। তাঁর দাবি, পদমর্যাদার জোরে লরনা তাঁকে বারবার এমন পরিস্থিতিতে ফেলতেন, যেখানে না বলতে পারা কঠিন হয়ে উঠত। এমনও অভিযোগ উঠেছে, তাঁকে জোর করে মাদক এবং যৌন উত্তেজক ওষুধ খাওয়ানো হত, এবং সেই অবস্থায় তাঁকে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হতো।

প্রথমে ‘জন ডো’ নামে মামলা করা হলেও পরে সামনে আসে অভিযোগকারীর পরিচয়—৩৫ বছর বয়সি চিরায়ু রাণা। চলতি সপ্তাহে দায়ের করা মামলায় তিনি বলেছেন, ২০২৪ সাল থেকেই এই নির্যাতন শুরু হয়। তাঁর আরও দাবি, লরনা তাঁকে স্পষ্ট হুমকি দিয়েছিলেন—তার কথা না শুনলে পদোন্নতি তো দূরের কথা, বোনাসও মিলবে না।

চিরায়ু জানিয়েছেন, তাঁকে ‘রোহিপনল’ আর ‘ভায়াগ্রা’র মতো ওষুধ দেওয়া হত। অভিযোগ এখানেই থেমে নেই। তাঁর কথায়, লরনা নাকি তাঁকে অবমাননাকর ভাষায় সম্বোধন করতেন—“আমার ছোট্ট বাদামি ছেলে” বলে ডাকতেন, যা তিনি বর্ণবিদ্বেষী আচরণ হিসেবে দেখছেন।

চিরায়ুর পরিচয় নিয়েও কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত, আবার কেউ দাবি করছেন তিনি নেপালের। তবে মোটের ওপর তাঁর শিকড় দক্ষিণ এশিয়াতেই।

এদিকে, অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, লরনা সময়-অসময়ে তাঁর ফ্ল্যাটে চলে যেতেন এবং তাঁকে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করতেন। এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই আমেরিকার কর্পোরেট মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।

এই বিতর্কের মাঝেই লরনার সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতিতে বদল এসেছে। তাঁর লিঙ্কডইন প্রোফাইল আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি এখন ব্যক্তিগত করা।

কিন্তু এই ঝড়ের আগ পর্যন্ত লরনার কেরিয়ার ছিল প্রায় নিখুঁত। জেপি মরগ্যানে ২০১১ সালে আর্থিক বিশ্লেষক হিসেবে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে উঠে এসেছেন নির্বাহী পরিচালক পদে। লেভারেজড ফিন্যান্স বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন তিনি—বড় কর্পোরেট গ্রাহকদের জন্য ঋণ জোগাড় করা, বন্ড ইস্যু—সবই তাঁর কাজের অংশ।

শিক্ষাগত দিক থেকেও তিনি কম যান না। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অফ বিজনেস থেকে ফিন্যান্স ও স্ট্যাটিস্টিকসে স্নাতক, তারপর হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল—এই পথ পেরিয়েই তিনি কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজের জায়গা পাকা করেছেন।

তবে অভিযোগ ওঠার পর সেই ঝকঝকে ছবিতে ফাটল ধরেছে। যদিও লরনা সব অভিযোগ সোজাসাপ্টা অস্বীকার করেছেন। তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, অভিযোগকারী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর কোনও অনুচিত সম্পর্ক ছিল না, এমনকি যে জায়গায় ঘটনার দাবি করা হচ্ছে, সেখানে তিনি কখনও যাননি।

মামলায় জেপি মরগ্যানকেও জড়ানো হয়েছে—অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ তদন্ত করেনি। তবে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, তাদের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় অভিযোগের কোনও ভিত্তি মেলেনি।

সব মিলিয়ে, ঘটনা এখন আদালতের পথে। সত্যি কী, তা নির্ধারণ করবে আইনি প্রক্রিয়াই। তবে আপাতত, কর্পোরেট দুনিয়ার এক উজ্জ্বল মুখকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ঘন কুয়াশা।

ছবি: সংগৃহীত