২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হারের ধাক্কা তখনও পুরোপুরি সামলে উঠতে পারেনি বঙ্গ বিজেপি। ভোট-পরবর্তী অশান্তির আবহে সেই সময় রাজ্যে এসেছিলেন অমিত শাহ। নিউটাউনের একটি হোটেলে দলের রাজ্য নেতৃত্বকে নিয়ে বৈঠকে তিনি সোজাসাপটা বলেছিলেন, এই হার নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বাংলায় বিজেপির সরকার না গড়া পর্যন্ত তিনি নিশ্চিন্তে বসবেন না—এমনটাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। এমনকি দলীয় পদে থাকুন বা না থাকুন, বাংলার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই রাখবেন বলেও জানান।
সময়ের সঙ্গে সেই কথারই যেন প্রতিফলন দেখা গেল। ‘এবার ২০০ পার’ স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিয়ে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে ২০৭টি আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিজেপি। এখন সামনে সরকার গঠনের পালা—কে হবেন মুখ্যমন্ত্রী, কারা থাকবেন মন্ত্রিসভায়, সেই নিয়েই চূড়ান্ত ব্যস্ততা।
নির্বাচনের আগে রাজ্যের রাজনীতি অনেকটাই নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন অমিত শাহ। এবার ভোটের পর দলের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক কাঠামো সাজানোর দায়িত্বও কার্যত তাঁর হাতেই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই তাঁকে পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছে বাংলায়। সঙ্গে সহ-পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। আজ, বুধবার সকালে কলকাতায় পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রী ও সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম চূড়ান্ত করার কথা তাঁর। দলীয় সূত্রের খবর, আজই পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচন হয়ে যেতে পারে। তারপর রাজভবনে গিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানানো হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২৫ বৈশাখ—রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন ব্রিগেডে শপথ নিতে পারে নতুন সরকার, যেখানে উপস্থিত থাকার কথা নরেন্দ্র মোদির।
ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বিজেপির একটি বড় রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল—উত্তরবঙ্গ বঞ্চিত। তাই নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে ভারসাম্য রাখার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। দলীয় মহলের মতে, উত্তরবঙ্গের বিধায়কদের যেন গুরুত্বহীন করে না রাখা হয়, সে বিষয়ে আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এবার নজর দেওয়া হচ্ছে তাঁদের ওপরও, যাঁরা তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতাদের হারিয়ে জয় পেয়েছেন। যেমন ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানো শুভেন্দু অধিকারীর নাম তো আছেই। পাশাপাশি দমদম উত্তরে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে হারানো সৌরভ শিকদার, টালিগঞ্জে অরূপ বিশ্বাসকে পরাজিত করা পাপিয়া অধিকারী, দিনহাটায় উদয়ন গুহকে হারানো অজয় রায়—এঁদেরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিধাননগরে সুজিত বসু, আসানসোল উত্তরে মলয় ঘটক এবং দমদমে ব্রাত্য বসুকে হারানো প্রার্থীরাও রয়েছেন সম্ভাব্য তালিকায়।
তবে শুধু প্রতিপক্ষকে হারানো নয়, নিজের দলের পরিচিত মুখ ও জনপ্রিয় নেতাদেরও মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দিলীপ ঘোষ, শংকর ঘোষ, নিশীথ প্রামাণিক, অগ্নিমিত্রা পাল—এই নামগুলোও ঘুরছে আলোচনায়।
এদিকে প্রশাসনিক স্তরেও বদলের ইঙ্গিত মিলছে। নবান্নের চেহারা বদলের পাশাপাশি নাম পরিবর্তনের কথাও শোনা যাচ্ছে। নতুন নাম হিসেবে ‘উন্নয়ন ভবন’-এর প্রস্তাব উঠে এসেছে, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট দপ্তর রাখা হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর এবার বাংলায় ক্ষমতার কেন্দ্রে বসতে চলেছে বিজেপি—আর সেই পথে অমিত শাহের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা বলাই যায়।

Social Plugin