স্ট্রংরুম ঘিরে রাতভর টানটান পরিস্থিতি, মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাড়ল উত্তেজনা

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটযন্ত্র আর ব্যালট বাক্স রাখা স্ট্রংরুমকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার রাতটা বেশ অস্বাভাবিকই কেটেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হঠাৎ সেখানে গিয়ে বসে পড়া—এই ঘটনাকে ঘিরে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস আর বিজেপির মধ্যে চাপা উত্তেজনা একেবারে প্রকাশ্যে চলে আসে।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই দলের নেতাদের মধ্যে কথার লড়াই, বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি গরম হতে থাকে। এরপরই নির্বাচন কমিশন রাজ্যের বিভিন্ন স্ট্রংরুম ও গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা আরও কড়া করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্ট্রংরুমের ২০০ মিটারের মধ্যে ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ, ওই এলাকায় পাঁচ জনের বেশি একসঙ্গে জড়ো হলেই তা বেআইনি বলে ধরা হবে।

পরিচয়পত্র দেখিয়েও বাধা, ক্ষুদিরাম কেন্দ্রে শশী পাঁজাকে ঘিরে টানাপোড়েন

শ্যামপুকুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী শশী পাঁজা—এই পরিচয় স্পষ্ট করে দেখানো সত্ত্বেও স্ট্রংরুম চত্বরে ঢুকতে গিয়ে আটকে দেওয়া হল তাঁকে। ঘটনাটা ঘিরে শনিবার সকালে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে খানিকটা উত্তেজনাও ছড়ায়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতিরিক্ত কড়াকড়ি নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। কলকাতা উত্তরের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটযন্ত্র এই ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রেই রাখা আছে। চারদিক শক্ত নিরাপত্তায় ঘেরা। নিয়ম মেনেই প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। তবে বিধি অনুযায়ী প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্টরা নির্দিষ্ট একটা সীমা পর্যন্ত যেতে পারেন। শনিবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ সেখানে পৌঁছন শশী পাঁজা। নিয়ম মেনেই তিনি স্ট্রংরুমের দিকে এগোতে গেলে এক কেন্দ্রীয় জওয়ান তাঁকে আটকে দেন। পরিচয়পত্র দেখিয়েও লাভ হয়নি, নিজের প্রার্থীপদ জানালেও অনুমতি মেলেনি। এই নিয়েই শুরু হয় বচসা, পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শেষমেশ কলকাতা পুলিশের এক আধিকারিক এগিয়ে এসে বিষয়টা পরিষ্কার করেন। তাঁর কথাতেই ভুল ভাঙে কর্তব্যরত জওয়ানের, তারপর পরিস্থিতি শান্ত হয়।

কলকাতার সাতটি জায়গায় যেখানে স্ট্রংরুম রয়েছে—সেগুলোর আশপাশে বিশেষ নজরদারি চলছে। ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র থেকে শুরু করে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, হেস্টিংস হাউস, যাদবপুরের এপিসি রায় পলিটেকনিক, ডায়মন্ড হারবার রোডের সেন্ট টমাস স্কুল, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল আর বাবা সাহেব অম্বেডকর এডুকেশন ইউনিভার্সিটি—সব জায়গাতেই মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী।

পুলিশ স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোনও ধরনের বিক্ষোভ বা জমায়েত চলবে না। অস্ত্র, লাঠি, দাহ্য পদার্থ বা এমন কিছু যা গোলমাল পাকাতে পারে—সবই নিষিদ্ধ। নিয়ম ভাঙলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবুও রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মী-সমর্থকরা বসে নেই। অনেক জায়গাতেই পালা করে তারা স্ট্রংরুমের বাইরে নজর রাখছেন। কোথাও কোথাও আবার সিসিটিভি ফুটেজের লাইভ ডিসপ্লে দেখে নিজেরাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন তৃণমূল, বিজেপি, বাম এবং কংগ্রেসের লোকজন।

ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পর থেকেই এই নজরদারি শুরু হয়েছিল। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতার ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের ভিতরে ‘সন্দেহজনক নড়াচড়া’ নিয়ে অভিযোগ তোলে তৃণমূল। তারপরই বাইরে অবস্থানে বসেন কুণাল ঘোষ ও শশী পাঁজা। সেই সময়েই দক্ষিণ কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে গিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা কাটান মুখ্যমন্ত্রী।

মমতার এই উপস্থিতির ছবি ছড়িয়ে পড়তেই রাতারাতি জেলাগুলোতেও চাঞ্চল্য দেখা যায়। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও তৃণমূল কর্মীরা স্ট্রংরুমের সামনে জড়ো হন, পাল্টা বিজেপির পক্ষ থেকেও জমায়েত শুরু হয়।

এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর সেখানে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল। পরে কলকাতা পুলিশের তরফে জানানো হয়, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

স্ট্রংরুম থেকে বেরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ভোটে কারচুপির আশঙ্কা থেকেই তিনি সেখানে ছিলেন। তাঁর কথায়, মানুষের ভোট কেউ লুট করার চেষ্টা করলে তিনি শেষ পর্যন্ত লড়বেন।

অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য নেতা শুভেন্দু অধিকারী পাল্টা দাবি করেন, কোনও নিয়ম ভাঙার সুযোগই পাননি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, কড়া নজরদারির মধ্যেই পুরো বিষয়টি হয়েছে এবং অতিরিক্ত কোনও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।