দিল্লি থেকে গাড়ি নিয়ে বের হলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় লোনি শহরে। দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু এই দ্রুত বেড়ে ওঠা শিল্পনগরী এখন এক অস্বস্তিকর কারণে পরিচিতি পেয়েছে—বায়ুদূষণের দিক দিয়ে রাজধানীকেও পেছনে ফেলেছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা আইকিউএয়ারের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত বছর লোনির বাতাস ছিল বিশ্বের সবচেয়ে খারাপগুলোর মধ্যে। শহরটা আকারে ছোট, কিন্তু সমস্যাটা ভয়ংকর বড়। কারখানার ধোঁয়া, যানবাহনের কালো ধোঁয়া আর চারপাশের নির্মাণকাজের উড়ন্ত ধুলা মিলে এখানে বাতাস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় সাত লাখ মানুষের এই শহরে দিন কাটে এমনই এক আবহে।
স্থানীয়দের কথায় সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট। ইলেকট্রিক রিকশাচালক মনোজ কুমার, বয়স পঁয়তাল্লিশ, সারা জীবন এখানেই কাটিয়েছেন। তাঁর কথায়, কাশি তো দূরের কথা, ঠিকমতো নিঃশ্বাস নেওয়াটাই কষ্টকর। আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ মোহমিন খান বললেন, বাড়ির বাইরে পা রাখলেই মাস্ক লাগাতে হয়। দূষণ এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, দিন হোক বা রাত—অবস্থা একই।
লোনির রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, চারদিকে চলছে নির্মাণকাজ। সেখান থেকে উড়তে থাকা ধুলা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। বাতাসে যে সূক্ষ্ম কণাগুলো ভাসে, তার মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো অতিক্ষুদ্র কণা—যেগুলো সরাসরি ফুসফুসের গভীরে ঢুকে যায়।
পরিসংখ্যানটা আরও চিন্তার। গত বছর এই কণার গড় মাত্রা ছিল ১১২ দশমিক ৫, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে প্রায় ২২ গুণ বেশি। এই কণাগুলো শুধু ফুসফুসেই থামে না, রক্তেও মিশে যেতে পারে। ফলে হাঁপানি, হৃদ্রোগ, এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও এর প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় চিকিৎসক ডা. অনিল সিং জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। বিশেষ করে কম বয়সী শিশুদের মধ্যেই এখন হাঁপানির লক্ষণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
দূষণের দিক দিয়ে শুধু লোনিই নয়, তালিকায় রয়েছে আরও বেশ কিছু শহর—চীনের হোটান, ভারতের বায়রনিহাট ও দিল্লি, পাকিস্তানের ফয়সালাবাদ, রহিম ইয়ার খান, লাহোর, সুক্কুর, ভারতের গাজিয়াবাদ এবং বাংলাদেশের ঢাকা।
ভারতের ক্ষেত্রে দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানা, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো আর নির্মাণকাজের ধুলা। শীতকালে সমস্যা আরও বাড়ে। ডিসেম্বর-জানুয়ারির দিকে উত্তর ভারতের আকাশে যেন এক ধরনের ঢাকনা পড়ে—ঠান্ডা ভারী বাতাস ওপরে উঠতে পারে না, ফলে দূষণ নিচেই আটকে থাকে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৯ সালে ভারত সরকার পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচি নেয়। লক্ষ্য ছিল ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে এই ক্ষতিকর কণার মাত্রা ৪০ শতাংশ কমানো। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ, বায়ু পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, জৈব জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ—এমন নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়।
কিছু জায়গায় সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন যথেষ্ট কড়া নয়, আর বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে।
দিল্লিতে দূষণ কমাতে কৃত্রিম বৃষ্টি ঘটানোর পরীক্ষাও হয়েছিল গত অক্টোবর মাসে, কিন্তু তাতে তেমন ফল মেলেনি। এরপর নভেম্বর মাসে দূষণ যখন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন বহু মানুষ রাস্তায় নেমে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানান।
তবে আশার দিকও আছে। চীন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আর বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে দূষণ অনেকটাই কমাতে পেরেছে। সেখানকার অভিজ্ঞতা বলছে, চাইলে পরিবর্তন সম্ভব—তবে তার জন্য দরকার ধৈর্য, কঠোর প্রয়োগ আর স্পষ্ট দিকনির্দেশ।

Social Plugin