একসময় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইনআপ। বিরাট কোহলি, ক্রিস গেইল, এবি ডি’ভিলিয়ার্সদের ব্যাটে রান পাহাড় গড়লেও শেষ পর্যন্ত ট্রফি অধরাই থেকে যেত। কারণ, ব্যাটিংয়ের চাকচিক্যের আড়ালে বোলিং বিভাগে ছিল বড়সড় ফাঁক। সেই পুরনো আরসিবি এখন অতীত। নতুন বেঙ্গালুরু বুঝে গেছে, শুধু রান করলেই হয় না, ম্যাচ জিততে হলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার মতো বোলিং আক্রমণও দরকার।
সেই উপলব্ধির ফল মিলল হাতেনাতে। আমেদাবাদের ফাইনালে গুজরাত টাইটান্সকে ৫ উইকেটে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার আইপিএল ট্রফি জিতে নিল বিরাট কোহলিদের দল। বহু বছরের সেই বিখ্যাত স্লোগান ‘ই সালা কাপ নামদু’ এখন আর শুধুই আবেগ নয়, বাস্তব।
ফাইনালে জয়ের ভিত গড়ে দেন বোলাররাই। ভুবনেশ্বর কুমার, জশ হ্যাজলউড এবং তরুণ রসিখ সালামের নিয়ন্ত্রিত ও আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের সামনে গুজরাতের ব্যাটাররা কখনও স্বস্তিতে খেলতে পারেননি। ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৫৫ রানেই থেমে যায় তাদের ইনিংস।
তারপর রান তাড়ায় নেমে আবারও দায়িত্ব নেন বিরাট কোহলি। চাপের ম্যাচে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং ধৈর্যের পরিচয় মিলল আরও একবার। ৪২ বলে অপরাজিত ৭৫ রানের ইনিংস খেলে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৮ ওভারেই লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে বেঙ্গালুরু।
এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে গত বছরের মেগা নিলামে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তারকাখচিত দল গড়ার বদলে ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড তৈরিতে জোর দেয় আরসিবি। কোহলি, রজত পাটীদার এবং যশ দয়াল ছাড়া প্রায় পুরো দলকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। নিলামে বড় নামের পিছনে অযথা অর্থ খরচ না করে দল নেয় ভুবনেশ্বর কুমার, জশ হ্যাজলউড, ফিল সল্ট এবং জিতেশ শর্মার মতো কার্যকর ক্রিকেটারদের। সেই পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।
৩৬ বছর বয়সী ভুবনেশ্বর কুমারকে অনেকেই হয়তো তাঁর সেরা সময় পেরিয়ে যাওয়া ক্রিকেটার বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু অভিজ্ঞ এই পেসার ফের প্রমাণ করলেন, দক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রণের কোনও বিকল্প নেই। গত মরশুমে ১৭ উইকেট নেওয়ার পর এবার আরও ধারালো হয়ে ২৮ উইকেট তুলে নেন তিনি। যদিও বেগুনি টুপির দৌড়ে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছেন কাগিসো রাবাডা, তবু আরসিবির বোলিং সাফল্যের অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন ভুবনেশ্বর।
তাঁর পাশে সমান কার্যকর ছিলেন হ্যাজলউড এবং রসিখ। পুরো মরশুম জুড়ে এই ত্রয়ী প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের উপর চাপ সৃষ্টি করে গিয়েছে। আর সেই কারণেই এবারের বেঙ্গালুরুকে অনেক বেশি পরিণত এবং ভয়ঙ্কর দল হিসেবে দেখা গিয়েছে।
ফাইনালের পর হ্যাজলউড বলেন, “প্রথম ট্রফির জন্য আমাদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে এবার দল হিসেবে আমরা অনেক বেশি শান্ত এবং আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। ভুবি পুরো মরশুম অসাধারণ বল করেছে। আমার মনে হয় না কোনও ম্যাচে ও খুব বেশি রান দিয়েছে।”
অন্যদিকে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলের সাফল্যকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ভুবনেশ্বর। তাঁর কথায়, “ট্রফি জেতাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বেগুনি টুপি না পাওয়ায় কোনও আক্ষেপ নেই। আমরা যে পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম, তা সফল হয়েছে। সেটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।”
বহু বছর ধরে সমর্থকদের হতাশার সঙ্গী ছিল আরসিবি। কিন্তু গত দু’টি মরশুমে তারা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধুমাত্র তারকা নির্ভর ক্রিকেট নয়, সঠিক পরিকল্পনা, ভারসাম্যপূর্ণ দল নির্বাচন এবং কার্যকর বোলিং আক্রমণই সাফল্যের আসল ভিত্তি। আর সেই পথেই হেঁটে আবারও আইপিএলের সিংহাসন নিজেদের দখলে রাখল বেঙ্গালুরু।

Social Plugin