হরমুজের ছায়াযুদ্ধ: আমেরিকাকে ঘিরে উপসাগরে ইরানের কড়া বার্তা

 

ওয়াশিংটনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা যখন অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশায়, ঠিক তখনই সুর আরও চড়াল তেহরান। প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলিকে কার্যত খোলাখুলি সতর্ক করে দিল ইরান— আমেরিকার পাশে দাঁড়ালে তার মূল্য চোকাতে হবে।

ইরানের উপরাষ্ট্রপতি ইসমাইল ইসফাহানি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তেহরানের ওপর হামলা হলে জবাব শুধু পাল্টা হবে না, হবে বহু গুণ বেশি। বিশেষ করে তেল কূপ বা জ্বালানি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাত এলে প্রতিক্রিয়া হবে ‘চারগুণ’। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর বার্তাটা ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ— ইরানের একটি তেল কূপের ক্ষতি মানে প্রতিপক্ষের চারটি কূপ বিপদের মুখে।

এই বক্তব্য নিছক হুঁশিয়ারি নয়, এর মধ্যে কৌশলও আছে। কারণ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চাপানউতোর এখন অনেকটাই শক্তির খেলা। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি এই হরমুজ। এখানে উত্তেজনা মানেই বিশ্ববাজারে প্রভাব।

এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজে চাপের জেরে ইরান প্রতিদিন বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে। তাঁর কথায়, প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ডলার লোকসান হচ্ছে তেহরানের। এমনকি ইরানের আর্থিক অবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি তিনি।

তবে জবাব এসেছে তেহরান থেকেও। ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফ মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু আমেরিকার চাপ নয়, ইরানের হাতেও পাল্টা চাল আছে। তাঁর যুক্তি, জ্বালানির বাজারে ইরানের অবস্থানকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে গরমের মরশুমে তেলের চাহিদা যখন চূড়ায়, তখন হরমুজে অচলাবস্থা আমেরিকারই গলায় কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই আবহে শান্তি আলোচনায় ফিরতে ওয়াশিংটনের সামনে নতুন করে শর্ত রেখেছে ইরান। প্রথম দাবি, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের নিশ্চয়তা। তেহরানের অবস্থান পরিষ্কার— এই দু’টি প্রশ্নে অগ্রগতি না হলে পরমাণু ইস্যুতে আলোচনায় ফেরার প্রশ্নই নেই।

ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই প্রস্তাব হোয়াইট হাউসের কাছে পৌঁছেছে। তবে আমেরিকা সেটি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এর মাঝেই নতুন উদ্বেগ ছড়িয়েছে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে প্রকাশিত কিছু রিপোর্ট। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে দাবি উঠেছে, দীর্ঘ সামরিক অভিযানে আধুনিক অস্ত্রের মজুদ অনেকটাই কমে এসেছে। স্টেলথ বিমান থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র, বিস্তর ব্যবহার হয়েছে সাম্প্রতিক সংঘাতে। ফলে শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, পুনরায় সেই মজুদ গড়ে তুলতে সময় ও খরচ— দুই নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

এই তথ্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের মতে, ইরানের আগ্রাসী সুর কেবল কূটনৈতিক বার্তা নয়, আমেরিকার দুর্বলতার সম্ভাব্য জায়গাগুলোকেও লক্ষ্য করে চাপ তৈরির চেষ্টা।

তেহরান এখন স্পষ্টতই বোঝাতে চাইছে, সংঘাতের অঙ্ক আর আগের মতো নেই। শুধু নিষেধাজ্ঞা আর চাপ দিয়ে ইরানকে কোণঠাসা করা যাবে না, সেই বার্তাই যেন বারবার তুলে ধরা হচ্ছে।

একদিকে অচল শান্তি আলোচনা, অন্যদিকে হরমুজ ঘিরে বাড়তে থাকা স্নায়ুযুদ্ধ— উপসাগরে এখন উত্তাপ শুধু কথার নয়, কৌশলেরও। আর সেই খেলায় ইরান জানিয়ে দিল, দরকার পড়লে তারা হিসেব মেলাবে নিজেদের নিয়মে।