পরীক্ষায় গাফিলতির প্রতিবাদে দিল্লিতে ‘আরশোলা’দের বিক্ষোভ, শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা দাবিতে সরব তরুণ প্রজন্ম

নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিতর্ককে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে ক্ষোভ উগরে দিল একদল তরুণ। শনিবার রাজধানী দিল্লির যন্তরমন্তরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির আয়োজন করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে হওয়া এই কর্মসূচিতে অংশ নেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, সামাজিক কর্মী এবং বামপন্থী রাজনৈতিক নেতারা।

সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক জাতীয় স্তরের পরীক্ষাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় কেন্দ্রের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটেই যন্তরমন্তরের জমায়েতে উপস্থিত হয়ে অভিজিৎ দিপকে হুঁশিয়ারি দেন, শিক্ষামন্ত্রী দ্রুত পদত্যাগ না করলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দেশজুড়ে বৃহত্তর আন্দোলনের সূচনা হবে। তিনি জানান, আগামী শনিবার দিল্লিতেই ফের অবস্থান-বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন লাদাখের পরিবেশ আন্দোলনের পরিচিত মুখ সোনম ওয়াংচুক এবং সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। ওয়াংচুক বলেন, অভিজিৎ দিপকেকে যদি গ্রেপ্তার করা হয়, তবে তিনি ছয় সপ্তাহের অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।

বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীতে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মোতায়েন করা হয়েছিল র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স। অশান্তির আশঙ্কায় দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির শুরুতেই কয়েকজন সমর্থককে আটক করে। যদিও শেষ পর্যন্ত যন্তরমন্তরে কর্মসূচি আয়োজনে প্রশাসনের অনুমতি মিলতে বিশেষ কোনও জটিলতা তৈরি হয়নি।

সকালেই দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছন অভিজিৎ দিপকে। তাঁর হাতে ছিল সংবিধান প্রণেতা ড. ভীমরাও আম্বেদকরের আত্মজীবনী। বিমানবন্দর থেকে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই তাঁকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার তরফে বিক্ষোভ কর্মসূচির অনুমোদন দেওয়া হয়।

যদিও এই আন্দোলনকে পুরোপুরি অরাজনৈতিক বলা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। কারণ মঞ্চে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখলেও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন এবং একাধিক বামপন্থী গোষ্ঠী বিক্ষোভে অংশ নেয়।

তবে রাজনৈতিক উপস্থিতির থেকেও বেশি নজর কাড়ে তরুণদের ভিড়। আরশোলার মুখোশ পরে, গায়ে প্রতিবাদী পোস্টার সেঁটে হাজার হাজার যুবক-যুবতী যন্তরমন্তরে জড়ো হন। তাঁদের অনেকেই কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য নন। কেউ ব্যাঙ্ককর্মী, কেউ কলেজপড়ুয়া, কেউ আবার চাকরিপ্রার্থী।

ব্যাঙ্ককর্মী দীপককুমার গুপ্তার কথায়, “প্রতিবাদটা কোথাও না কোথাও শুরু হওয়া দরকার ছিল। কেউ না কেউ সেই দায়িত্ব নিতেই হত।”

অন্যদিকে, স্নাতকস্তরের ছাত্র প্রিন্সের অভিযোগ, “ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলছে সরকার। চাকরির সুযোগ কমছে, তার উপর পরীক্ষাগুলিও সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।”

দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান অভিজিৎ দিপকে। তাঁর দাবি, ‘ককরোচ’ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁর পরিবারের উপর বিভিন্ন ধরনের চাপ ও হুমকি আসছে। কিন্তু তাতেও পিছু হটার কোনও ইচ্ছা নেই বলে জানিয়ে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা আদায় হোক বা না হোক, ভবিষ্যতে অন্য জনস্বার্থের বিষয় নিয়েও তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেড়ে ওঠা এই নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম অনেকটাই আম আদমি পার্টির শুরুর দিনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আর সেই কারণেই এই আন্দোলনের দিকে নজর রাখতে শুরু করেছে দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলিও।