যুদ্ধের ক্লান্তি যখন দুই পক্ষকেই চেপে ধরেছে, তখনই নতুন এক প্রস্তাব নিয়ে সামনে এসেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তারা ১৪ দফার একটি পরিকল্পনা দিয়েছে—কথায় কথায় যুদ্ধবিরতি নয়, এবার তারা চায় পুরো সংঘাতটাই শেষ হোক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রস্তাব আদৌ বাস্তবসম্মত কি না, আর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব তা মেনে নিতে কতটা প্রস্তুত।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি তিনি খুঁটিয়ে দেখছেন। তবে চুক্তি হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিজেই খুব আশাবাদী নন। তার আগের দিনই পাকিস্তানের মাধ্যমে আসা আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, আলোচনার পথ এখনো মসৃণ হয়নি।
ইরানের এই নতুন প্রস্তাবটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ৯ দফা পরিকল্পনার জবাব। সেখানে দুই মাসের যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ইরান সেই সীমিত সময়ের বিরতিতে আগ্রহী নয়। তারা বলছে, সমস্যা যদি মেটাতেই হয়, তাহলে সেটা দ্রুত এবং স্থায়ীভাবে করতে হবে—প্রায় এক মাসের মধ্যেই সব ঝামেলার নিষ্পত্তি চায় তারা।
এই ১৪ দফায় ইরান কয়েকটি বড় দাবি তুলেছে। ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা, তাদের চারপাশ থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত দেওয়া, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া—এসব তো আছেই। সঙ্গে আছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর দাবি। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টি অবশ্য হরমুজ প্রণালী—বিশ্বের তেল পরিবহনের এক বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই যায়। এই জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও ইরান নতুন কাঠামোর কথা বলছে।
এখানেই মূল জট। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানকে আগে হরমুজ প্রণালীতে তাদের কার্যত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হবে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও তার অবস্থান কঠোর—এটা তার কাছে একেবারে লাল দাগের মতো, যার বাইরে তিনি যেতে চান না।
অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় থেকেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার রাখে। সেই অধিকার থেকে তারা সরে আসবে না। বরং তাদের অর্থনীতি যেভাবে নিষেধাজ্ঞার চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটার অবসান চায় তারা।
এই অবস্থায় দুই পক্ষ যেন দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে নিরাপত্তা আর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, অন্যদিকে সার্বভৌমত্ব আর অর্থনৈতিক চাপের বাস্তবতা। মাঝখানে পড়ে আছে কূটনীতি—যেটা এখনো পথ খুঁজছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের ভাষায়, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা যুক্তরাষ্ট্রের। তারা কি আলোচনার পথেই এগোবে, নাকি আগের মতোই চাপ আর সংঘাতের কৌশল চালিয়ে যাবে—সেটাই দেখার।
সব মিলিয়ে ছবিটা খুব পরিষ্কার নয়। কিছুটা নমনীয়তার আভাস পাওয়া গেলেও, মূল ইস্যুগুলোতে এখনো বড় ফারাক রয়ে গেছে। তাই আপাতত বলা যায়, প্রস্তাবটি টেবিলে আছে ঠিকই, কিন্তু সমাধান এখনো দূরের পথ।

Social Plugin