সমুদ্রের তলায় ছায়াযুদ্ধ: হুঁশিয়ারি, রহস্য আর অস্থির কূটনীতি

উপরের দিকে সব শান্ত—কিন্তু ভিতরে ভিতরে চাপ বাড়ছেই। সংঘর্ষ থামানোর যে চেষ্টা চলছিল, সেটাও এখন কেমন যেন ঝুলে আছে। কথা হচ্ছে, আবার থেমেও যাচ্ছে। এই অবস্থায় পাকিস্তান বলছে, ইরান আর আমেরিকার মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, যদিও পরিস্থিতি খুব স্থিতিশীলও নয়।

এদিকে দুই পক্ষই নিজেদের সুর ক্রমশ চড়িয়ে চলেছে। ওয়াশিংটনের ভেতরে নাকি নতুন করে হামলার পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে—উদ্দেশ্য, ইরানকে ফের আলোচনার টেবিলে টেনে আনা। অন্যদিকে তেহরানও বসে নেই। সরাসরি না বললেও, লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে কড়া বার্তা দিচ্ছেন দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলি খামেনেই। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরিকাঠামো রক্ষা করা ইরানের কাছে শুধু কৌশল নয়, জাতীয় অঙ্গীকার।

বন্ধুত্বে চিড়: জার্মানিকে ঘিরে ট্রাম্পের নতুন চাপ

ইরান ইস্যুতে পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, ততই অস্বস্তি বাড়ছে ওয়াশিংটনে। সেই চাপটা এবার ছড়িয়ে পড়ছে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গেও। ন্যাটো নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষ নতুন কিছু নয়—বরাবরই তিনি এই জোটকে তেমন গুরুত্ব দেন না, কখনও কখনও সরাসরি কটাক্ষও করেছেন। এবার সেই রেশ গিয়ে পড়ল জার্মানির উপর। বুধবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দিলেন, সেখানে মোতায়েন মার্কিন সেনার সংখ্যা কমানো হতে পারে। কথাটা আপাতভাবে ইঙ্গিত হলেও, এর রাজনৈতিক তাৎপর্য যথেষ্ট গভীর। ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, ইরান পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে আমেরিকা চাপের মুখে পড়েছে, এমনকি তাদের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এই মন্তব্য যে ট্রাম্পের ভালো লাগেনি, তা বোঝা যাচ্ছিলই। তার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর টানাপোড়েন চোখে পড়ছে। শোনা যাচ্ছে, জার্মানিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানোর বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। খুব বেশি দেরি না করেই এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও আসতে পারে। সব মিলিয়ে, মিত্রতার সম্পর্কেও যে ফাটল ধরতে পারে, সেই ইঙ্গিতটাই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

হুঁশিয়ারির ভাষাও কম তীক্ষ্ণ নয়। পারস্য উপসাগরকে ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে, প্রয়োজনে আমেরিকার জন্য জলতলই হয়ে উঠতে পারে বিপদের জায়গা। এই আবহেই ইরানের নৌবাহিনীর কমান্ডার শাহরাম ইরানির একটি মন্তব্য নতুন করে কৌতূহল বাড়িয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, খুব শিগগিরই এমন এক অস্ত্র সামনে আনবে ইরান, যা দেখলে শত্রুপক্ষের আতঙ্ক হওয়া স্বাভাবিক।

কী সেই অস্ত্র? স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি। তবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেটা হাতের কাছেই রয়েছে এবং প্রয়োজনে ব্যবহারও করা হবে। এই রহস্য ঘিরেই নানা জল্পনা। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এটি হয়তো ‘হুট’ নামে পরিচিত এক ধরনের রকেট টর্পেডো। পানির তলায় অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে গিয়ে শত্রুর সাবমেরিন বা যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানতে পারে—প্রতিরোধের সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

সাধারণ টর্পেডোর গতি যেখানে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ১০০ কিলোমিটার, সেখানে এই ‘হুট’ যদি সত্যিই কার্যকর হয়, তার গতি হতে পারে প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। নামের মধ্যেই একটা ইঙ্গিত আছে—ইরানিতে ‘হুট’ মানে তিমি। বিশাল, দ্রুত আর মারাত্মক। হরমুজ প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে এমন অস্ত্রের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে মার্কিন নৌবাহিনীর।

এর মাঝেই আরেকটা খবর সামনে এসেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ফোনে কথা হয়েছে। সেখানে পুতিন নাকি আবারও প্রস্তাব দিয়েছেন, ইরানকে পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম ইস্যুতে চুক্তির পথে ফেরাতে তিনি মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন—কেউ পুরোপুরি পিছু হটছে না, আবার কেউ সরাসরি সংঘর্ষেও নামছে না। কিন্তু চাপটা যে বাড়ছে, সেটা আর লুকোনো যাচ্ছে না।