গণতন্ত্রের ভিত যতই মজবুত হোক, তার অন্যতম ভরকেন্দ্র তো সংবাদমাধ্যমই। কিন্তু সেই স্তম্ভটাই যদি টলতে শুরু করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র’ বলে পরিচিত ভারতে এখন ঠিক সেই প্রশ্নটাই সামনে এনে দিয়েছে ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’-এর ২০২৬ সালের রিপোর্ট।
এই সংস্থার ‘প্রেস ফ্রিডম সূচক’-এ এ বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৫৭। গত বছর ছিল ১৫১। মানে, এক বছরে আরও পিছিয়ে যাওয়া। কেন এমন হল? রিপোর্টে তার ব্যাখ্যাও বেশ খোলামেলাভাবে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের সংবাদমাধ্যম যেন এক ধরনের ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থার’ মধ্যে রয়েছে।
সংস্থার পর্যবেক্ষণ বলছে, এই সময়ে সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ ও হেনস্তার ঘটনা বেড়েছে। শুধু তাই নয়, বড় বড় সংবাদমাধ্যমের মালিকানাও নাকি ক্রমশ সীমিত কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যাদের সঙ্গে শাসক দলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। ‘গোদি মিডিয়া’ বলে যে শব্দটা এখন প্রায় প্রচলিত, সেটারও উল্লেখ রয়েছে এই রিপোর্টে।
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়েও সরাসরি সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি নিয়মিত সাংবাদিক সম্মেলন করেন না। বরং এমন ব্যক্তিদেরই সাক্ষাৎকার দেন, যারা তাঁর প্রশংসায় সরব থাকেন। অন্যদিকে, যাঁরা প্রশ্ন তোলেন বা ভিন্ন মত পোষণ করেন, তাঁদের অনেক সময় ট্রোলিং, হুমকি বা আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়। কখনও দেশদ্রোহের অভিযোগ, কখনও মানহানির মামলা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সহজ নয়।
তবে সমস্যা শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গোটা বিশ্বেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নাকি চাপে। রিপোর্ট বলছে, গত ২৫ বছরে এমন খারাপ পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশ এখন ‘গুরুতর’ বা ‘অতি গুরুতর’ অবস্থায় পড়েছে এই সূচকে।
এই তালিকার একেবারে উপরে রয়েছে নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, এস্তোনিয়া, ডেনমার্ক ও সুইডেন—যেখানে সংবাদমাধ্যম এখনও তুলনামূলকভাবে স্বাধীন। আর একেবারে নীচের দিকে সৌদি আরব, ইরান, চীন, উত্তর কোরিয়া ও এরিত্রিয়া। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ভারতের বেশ কয়েকটি প্রতিবেশী দেশও এই সূচকে এগিয়ে—নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, বাংলাদেশ এমনকি পাকিস্তানও।
রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের কথাও এসেছে। সেখানে অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে দাবি। কয়েক ধাপ নেমে এখন তারা ‘সমস্যাসংকুল’ বিভাগে। একইভাবে রাশিয়ার ক্ষেত্রেও কড়া সমালোচনা করা হয়েছে—বিশেষ করে কঠোর আইন ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে।
সব মিলিয়ে ছবিটা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। প্রশ্নটা এখন একটাই—সংবাদমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের সেই চতুর্থ স্তম্ভটা ঠিক কতটা দৃঢ় থাকবে?

Social Plugin