পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘ ১০৮ দিনের সংঘাত অবসানের পথে— এমনই ইঙ্গিত মিলল সোমবার ভোরে। কয়েকদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, রবিবারের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হতে পারে। তবে লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান সেই সম্ভাবনার সামনে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। শেষ পর্যন্ত নতুন করে আলোচনার পর দুই পক্ষ শান্তিচুক্তির বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ প্রথম এই সমঝোতার কথা প্রকাশ্যে আনেন। পরে সমাজমাধ্যমে ট্রাম্পও একই ইঙ্গিত দেন। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে আগামী ১৯ জুন, শুক্রবার সুইৎজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে শান্তিচুক্তিতে সই হবে। এর আগে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি ভার্চুয়াল সমঝোতা স্মারকেও ডিজিটাল স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। মার্কিন পক্ষের হয়ে ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স এবং ইরানের পক্ষ থেকে স্পিকার মহম্মদ বাঘের ঘালিবাফ তাতে সই করেছেন বলে জানা গিয়েছে। দুই দেশই এই তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেছে।
তবে চুক্তির পথ এখনও পুরোপুরি মসৃণ নয়। সবচেয়ে বড় আপত্তি তুলেছে ইজরায়েল। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ইরান ও আমেরিকার এই সমঝোতার সঙ্গে তাদের কোনও সম্পর্ক নেই এবং তারা এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি ফিরবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে, শেষ মুহূর্তে শান্তিচুক্তির খসড়ায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইরান এবং ওমানের দাবি ছিল, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অর্থ আদায়ের অধিকার তাদের থাকতে হবে। সেই দাবি মেনে নেওয়ার পরই আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে খবর। যদিও এই বিষয়ে আমেরিকার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি।
চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, আমেরিকা ইরানের বাজেয়াপ্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেবে। বিনিময়ে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাবে না। পাশাপাশি ইরানের উপর আরোপিত একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে নেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত শর্ত নিয়ে আলোচনা হবে। তারপরই চূড়ান্ত রূপ পাবে সমগ্র চুক্তি।
এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভূমিকাও প্রশংসা করেছেন। কিন্তু ইজরায়েলের অবস্থান এখনও অনড়। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সমাজমাধ্যমে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইজরায়েল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। নিজেদের নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা নিজেদের সিদ্ধান্তই নেবে। ইরান-আমেরিকা চুক্তি তাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, হিজবুল্লার সঙ্গে কোনও সমঝোতা হবে না এবং লেবাননের দখলীকৃত এলাকা থেকেও ইজরায়েলি সেনা সরবে না।
ফলে কাগজে-কলমে শান্তিচুক্তির পথ খুললেও বাস্তবে পরিস্থিতি এখনও জটিল। লেবাননে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকলে ইরানের অবস্থানও বদলে যেতে পারে। সেই কারণেই পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক মহল এখন তাকিয়ে রয়েছে ১৯ জুনের দিকে, যখন বোঝা যাবে এই শান্তি উদ্যোগ সত্যিই নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে কি না।

Social Plugin