দীর্ঘ বিতর্ক, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং একাধিক আইনি জটিলতার পর অবশেষে রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সংশোধিত ভোটার তালিকার ভিত্তিতেই বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে এবং নতুন সরকারও গঠিত হয়েছে। কিন্তু এসআইআর পর্ব শেষ হলেও ভোটারদের একাংশের উদ্বেগ এখনও কাটেনি। বরং নির্বাচন মিটতেই নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সেই আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছিল। নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে সেগুলির নিষ্পত্তি এতদিন স্থগিত ছিল। এখন সেই আবেদনগুলির পর্যালোচনা শুরু হয়েছে। তবে আগের মতো শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় নথি জমা দিলেই নাম তালিকাভুক্ত হবে না। নতুন নিয়মে আবেদনপত্রে বা জমা দেওয়া তথ্য-নথিতে সামান্যতম অসঙ্গতি বা সংশয় দেখা দিলেই আবেদনকারীকে শুনানির মুখোমুখি হতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ব্যবহৃত ৬ নম্বর ফর্মের সঙ্গে এবার একটি অতিরিক্ত তথ্যপত্রও জমা দিতে হবে। সেখানে আবেদনকারীকে জানাতে হবে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর বাবা-মা বা অন্য কোনও আত্মীয়ের নাম ছিল কি না এবং থাকলে সেই যোগসূত্রের প্রমাণ কী। কমিশনের কাছে সেই তথ্য সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শুনানির জন্য ডাকা হবে।
ফলে অনেকের আশঙ্কা, এসআইআর চলাকালীন যে দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়া, নথিপত্র সংগ্রহ এবং লাইনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল, নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
কমিশনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, যাঁরা সদ্য ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করে প্রথমবার ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর হবে। রিটার্নিং অফিসার আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া সমস্ত নথি খতিয়ে দেখবেন। কোনও বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হলে আবেদনকারীকে ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে তথ্যের ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।
আগে নতুন ভোটার হিসেবে নাম তুলতে সাধারণত জন্মতারিখের প্রমাণপত্র এবং বাবা-মা বা অভিভাবকের ভোটার পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য জমা দিলেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। কিন্তু এবার সেই নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। নতুন ফর্মে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে পারিবারিক যোগসূত্রের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় রাজ্যের লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৭ লক্ষ মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে আপিল ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। আবার অনেকেই ট্রাইবুনালে না গিয়ে নতুন করে ৬ নম্বর ফর্ম জমা দিয়ে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করেছেন।
কমিশন সূত্রের খবর, এই আবেদনকারীদের প্রায় প্রত্যেককেই শুনানির মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুনানির নোটিসে আবেদনকারীদের জন্মসনদ, মাধ্যমিক পরীক্ষার শংসাপত্র, প্যান কার্ড, আধার কার্ড, পাসপোর্ট আকারের ছবি এবং ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় থাকা বাবা-মা বা আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আত্মীয়ের বৈধ নথিও সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, নতুন ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে এবার অনেক বেশি যাচাই-নির্ভর করে তোলা হয়েছে। ফলে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে গেলে আবেদনকারীকে কার্যত নিজের যোগ্যতা ও পরিচয় একাধিক স্তরে প্রমাণ করতে হবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
নতুন নিয়মে ৬ নম্বর ফর্মের সঙ্গে যুক্ত অতিরিক্ত তথ্যপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হচ্ছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আবেদনকারীর কোন আত্মীয়ের নাম রয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি কী। সেই তথ্যই এখন নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে উঠেছে।

Social Plugin