যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলা যেভাবে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে

মার্কিন আর ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যেন হঠাৎ করেই অন্য এক পথে মোড় নিয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, বিষয়টা কেবল সামরিক শক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা পারমাণবিক ঝুঁকির হিসাব–নিকাশ। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এর পেছনে আরও গভীর এক বিশ্বাস আর ইতিহাস কাজ করছে—বিশেষ করে শিয়া ধর্মীয়-রাজনৈতিক চিন্তার ভিত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, এত বড় ধাক্কা ইরানকে দুর্বল করার বদলে উল্টো দেশটার ভেতরের বন্ধনটাই আরও শক্ত করে দিচ্ছে। কারণ ইরানের শাসনব্যবস্থা শুধু প্রশাসন বা ক্ষমতার কাঠামো না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘শাহাদাত’ বা আত্মত্যাগের এক পুরনো ধারণা। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগ শিয়া মানসে যেভাবে গেঁথে আছে, বর্তমান সংঘাতকেও অনেকেই সেই একই ‘ন্যায় আর অন্যায়ের লড়াই’ হিসেবে দেখছে।

খামেনির মৃত্যুর পর যেভাবে রাতভর শোকানুষ্ঠান হয়েছে, আর বাসিজের মতো আধাসামরিক গোষ্ঠীর সদস্যরা যেভাবে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে, তাতে বোঝা যায় এই লড়াই এখন শুধু অস্ত্রের নয়। এখানে বিশ্বাস, পরিচয় আর টিকে থাকার প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে।

পশ্চিমা দেশগুলো হয়তো ভেবেছিল, এত চাপ দিলে ইরান ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে অন্য ছবি। বাইরের আক্রমণ ইরানের মানুষের মধ্যে এক ধরনের ঘেরাও হয়ে থাকার অনুভূতি তৈরি করেছে। ফলে অনেকেই নিজেদের সরকারের ওপর ক্ষোভ থাকলেও, সেটা সরিয়ে রেখে বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে। এমনকি যারা শাসনব্যবস্থার সমালোচক, তারাও এই সময়ে রাষ্ট্রের বিপক্ষে দাঁড়াতে চাইছে না।

এই অবস্থায় ইরান যেন ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি এক ক্ষয়যুদ্ধের পথে হাঁটছে—যেখানে নিজেদের ক্ষতিও মেনে নিয়ে প্রতিপক্ষের ধৈর্য ভেঙে দেওয়াই লক্ষ্য।

এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’-এর দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে ইরানের জন্য একটা স্পষ্ট ‘শত্রুর চেহারা’ তৈরি করা সহজ হয়েছে, যা তাদের পুরনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কথাগুলোকে আবারও সামনে আনার সুযোগ দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সামরিকভাবে ক্ষতি হলেও ইরান আদর্শের দিক থেকে নতুন করে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে। এই যুদ্ধের একটা বড় ট্র্যাজেডি এখানেই—বাইরে থেকে যত বেশি আঘাত আসছে, ভেতরের বিশ্বাস আর গল্পগুলো ততই শক্ত হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত হয়তো ইরানের বাস্তব শক্তি কিছুটা ক্ষয়ে যাবে, কিন্তু তাদের আদর্শের গল্পটা আরও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে।