ভোটের কাজে পুলিশ রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে 'দখলদারদের' মতো অধিগ্রহণ করতে পারে! আইনে কি বলে?


 নির্বাচন এলেই একটা পুরনো আশঙ্কা আবার সামনে চলে আসে—কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যে রাস্তায় বেরোলেই যদি হঠাৎ পুলিশ গাড়ি থামিয়ে সেটাকে ভোটের কাজে নিয়ে নেয়! বহুদিন ধরেই এই অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ বারও ভোটের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে একই প্রশ্ন তুলছেন—নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বেরোলে সেটা কি নিরাপদ?

মঙ্গলবার সকালে সেই বিতর্কে নতুন করে আগুন জ্বালালেন অভিনেতা অরিত্র দত্ত বণিক। ডানলপ থেকে নিজের গাড়িতে ফিরছিলেন তিনি। অভিযোগ, পথে পুলিশ তাঁর গাড়ি থামিয়ে সেটিকে ভোটের কাজে নেওয়ার কথা জানায় এবং হাতে একটি রিকুইজিশন স্লিপ ধরিয়ে দেয়। ঘটনাটা নিয়ে অরিত্র সরাসরি প্রশ্ন তোলেন—ব্যক্তিগত গাড়ি কি এভাবে মালিকের অনুমতি ছাড়া নেওয়া যায়? রাস্তায় দাঁড় করিয়ে যে কোনও গাড়ি দখল করার অধিকারই বা পুলিশের আছে কি?

এই প্রসঙ্গে আবার সামনে আসছে কলকাতা হাইকোর্টের ২০০৬ সালের একটি রায়। সেই মামলায় বিচারপতি গিরিশচন্দ্র গুপ্ত স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ভোটের জন্য গাড়ি নেওয়ার দায়িত্ব জেলাশাসকের। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নম্বর উল্লেখ করে আগে থেকেই রিকুইজিশন পাঠাতে হবে মালিকের কাছে। যে দিন গাড়ি প্রয়োজন, সে দিন মালিক বা চালক সেটি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেবেন। অর্থাৎ, এখন যেমন ছাপানো ফর্ম হাতে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুলিশ গাড়ি ‘ধরে’ নিচ্ছে—আইনজীবীদের মতে, সেই পদ্ধতি ঠিক নয়।

তবে এখানেই শেষ নয়। আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, ব্যক্তিগত গাড়ি আদৌ ভোটের কাজে নেওয়া যাবে কি না, সেই জায়গায় রায়টি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়—সেখানে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট—রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে পুলিশ সরাসরি গাড়ি অধিগ্রহণ করতে পারে না, সেটা ব্যক্তিগত হোক বা বাণিজ্যিক।

প্রতি নির্বাচনের আগেই এই নিয়ে হাইকোর্টে নড়াচড়া শুরু হয়। আইনজীবীদের সংগঠন থেকে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানানো হয়, তাঁদের গাড়ি যেন রিকুইজিশন না করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে সেই অনুরোধ মানাও হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যাঁরা জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের জন্য সমস্যাটা থেকেই যায়।

বাস্তবে কী হয়? অনেক গাড়ির মালিকই বলছেন, ভোটের আগে অকারণে ঝামেলা এড়াতে তাঁরা নিজের জেলার বাইরে গাড়ি নিয়ে যেতে চান না। কারণ একবার অন্য জেলায় গেলে স্থানীয় থানার তরফে রিকুইজিশন এলে, ভোটের আগের দিন গাড়ি জমা দিতে হয়। তারপর কয়েক দিন সেই গাড়ি ব্যবহার হয় প্রশাসনের কাজে।

যদিও রাজ্য পুলিশের এক শীর্ষকর্তার বক্তব্য, নির্বাচন চলাকালীন সবকিছুই নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে হয়। সেই অনুযায়ী প্রয়োজন বুঝে গাড়ি নেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে সংশয় রয়ে গেছে, এই বিতর্কই তার প্রমাণ।