পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম এখন ভোটার তালিকায় ‘ডিলিটেড’ হিসেবে ঝুলে আছে। এঁরা সবাই এই দেশের নাগরিক, তবু আপাতত ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। ৬ এবং ৯ এপ্রিল দুই দফায় তালিকা ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—ট্রাইবুনাল যদি তাঁদের বৈধ বলে মানে, তাহলে কি আসন্ন নির্বাচনে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন? এই জবাবের আশাতেই আজ সবার চোখ সুপ্রিম কোর্ট-এর দিকে। দুপুর আড়াইটে নাগাদ প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা।
ঘটনাটা আরও জটিল হয়েছে এভাবে—প্রথমে খসড়া তালিকায় নাম ছিল, তারপর হঠাৎই ‘বিচারাধীন’ তকমা জুড়ে দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। মোট ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের নির্দেশে ১৯টি ট্রাইবুনাল গড়া হলেও, নির্বাচন কমিশনের ধীরগতির কারণে এখনও কোনও সুরাহা হয়নি।
আজ সুপ্রিম কোর্ট-এ পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর মামলার শুনানি রয়েছে। ঠিক হয়েছে, দুপুর আড়াইটে নাগাদ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত-এর বেঞ্চে এই মামলাটি উঠবে। এর মধ্যে রাজ্যে দু’দফার ভোটের জন্য ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী, একবার তালিকা চূড়ান্ত হলে নতুন করে নাম যোগ করার সুযোগ আর থাকে না। ফলে যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের এখন একমাত্র ভরসা আদালতের নির্দেশ। গতবারের শুনানিতে আদালত ইঙ্গিত দিয়েছিল, যাঁদের মামলা ট্রাইবুনালে নিষ্পত্তি হয়েছে, তাঁদের বিষয়টি আলাদা করে বিবেচনা করা যেতে পারে। তাই আজকের শুনানিতে আদালত ঠিক কী অবস্থান নেয়, সেটাই এখন দেখার।
এই অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আবেদন জানিয়েছেন—পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করা হোক, যাতে এই ভোটারদের সুযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাতে রাজি নয়। তাদের যুক্তি, এক রাজ্যের জন্য আলাদা নিয়ম করা যাবে না। নিয়ম বলছে, মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত যাঁদের নাম তালিকায় থাকবে, তাঁরাই ভোটার।
কিন্তু এখানেই আপত্তি তুলেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের প্রশ্ন, কমিশনের ভুলের দায় সাধারণ মানুষ নেবে কেন? এই যুক্তিতেই মোস্তারি বানু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী-সহ মোট ১১টি মামলার আবেদনকারী কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এমনকি বৈধ পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও কেন নাম বাদ পড়েছে, সেই প্রশ্নও উঠেছে। একই পরিবারের ১৩ জনের নাম তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার ঘটনাও আদালতে উঠছে।
অন্যদিকে, এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এমনকি বিজেপির শরিক দলও সরব। কোনও রকম পূর্বনোটিস ছাড়াই নাম কেটে দেওয়ার অভিযোগে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিকের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র সরোবর থানা-য় অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
অভিযোগকারীদের একজন দেবাশিস বটব্যাল। তাঁর স্ত্রীর নাম তালিকায় থাকলেও, নিজের নাম নেই। অথচ তাঁদের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে এই রাজ্যের বাসিন্দা—১৮৫২ সাল থেকে হুগলির খানাকুলে তাঁদের বসবাস। এই পরিবার থেকেই একসময় জনপ্রিয় অভিনেতা প্রদীপ কুমার উঠে এসেছিলেন। এতদিন নিয়মিত ভোটার হওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ করে নাম বাদ যাওয়ায় ক্ষুব্ধ তিনি। থানায় অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তাদের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন।

Social Plugin