ইরানে গুলিতে ভূপাতিত হওয়া মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের যে দ্বিতীয় ক্রু সদস্যকে দুই দিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, শেষ পর্যন্ত তাকেও উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার যুক্তরাষ্ট্র এ তথ্য জানিয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ওই ক্রু এখন নিরাপদে আছেন এবং তার শারীরিক অবস্থাও স্থিতিশীল—এ কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের একটি পাহাড়ি এলাকায় বিমানটি ভেঙে পড়ে। ইরানের দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই আধুনিক এই মার্কিন যুদ্ধবিমানটিকে ভূপাতিত করা হয়েছে।
বিমানে তখন দু’জন ছিলেন—একজন পাইলট, আরেকজন ক্রু সদস্য। দুর্ঘটনার পরপরই মার্কিন বাহিনী উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রথমদিকে পাইলটকে উদ্ধার করা গেলেও দ্বিতীয় জনের কোনো খোঁজ মিলছিল না। তাকে খুঁজে পেতে পরবর্তী দুই দিন জোর তল্লাশি চালানো হয়।
এদিকে ইরানও নিখোঁজ ওই মার্কিন সেনাকে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এমনকি তাকে জীবিত ধরে দিতে পারলে প্রায় ৫০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৬৬ হাজার ডলার) পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয় দেশটির সামরিক বাহিনী। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারাও খোঁজাখুঁজিতে নেমে পড়েন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, অনেক মানুষ পাহাড়ি এলাকায় গিয়ে তাকে খুঁজছেন।
এর আগেই অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করে। মার্কিন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়। তবে ট্রাম্পের দাবি, বাস্তবে আরও বড় পরিসরে অভিযান চালানো হয়েছিল—দক্ষিণ ইরানের ওই এলাকায় “কয়েক ডজন বিমান” পাঠানো হয়েছিল।
কীভাবে উদ্ধার হলো? বিধ্বস্ত কোনো যুদ্ধবিমানের ক্রুদের উদ্ধার করা যে কতটা কঠিন, সেটা যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তারাই সবচেয়ে ভালো জানেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার’ বা সিএসএআর—শুনতে যতটা সরল লাগে, বাস্তবে ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। এই ধরনের মিশনে যেসব সেনা যান, তারা আলাদা করে প্রস্তুত থাকেন। কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে টিকে থাকতে হয়, কীভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়—এসব নিয়েই তাদের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ। কারণ এখানে এক মুহূর্তের ভুল মানেই বড় বিপদ। অভিযানগুলো সাধারণত হেলিকপ্টার ঘিরেই হয়। এগুলো নিচু দিয়ে উড়ে, যতটা সম্ভব আড়ালে থেকে কাজটা সেরে ফেলতে হয়। তবে শুধু হেলিকপ্টারই নয়, আকাশে আরও যুদ্ধবিমান থাকে—ওগুলো মূলত পাহারার কাজ করে, যাতে উদ্ধারকারী দল নিরাপদে কাজটা শেষ করতে পারে। এই ঘটনাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দক্ষিণ ইরানের পাহাড়ি এলাকায় নিখোঁজ ক্রুকে খুঁজে বের করতে যুক্তরাষ্ট্র বেশ বড় পরিসরেই অভিযান চালায়। কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান, আর সঙ্গে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকশ’ সেনা—সব মিলিয়ে ব্যাপারটা ছোটখাটো কিছু ছিল না। রোববার সামাজিক মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানালেন, অবশেষে সেই ক্রুকে পাওয়া গেছে। তার ভাষায়, গত কয়েক ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী ইতিহাসের অন্যতম সাহসী উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া সেনা একজন অভিজ্ঞ কর্নেল। দুর্ঘটনার সময় তিনি আহত হন ঠিকই, তবে অবস্থা এখন নিয়ন্ত্রণে।
শেষ পর্যন্ত রোববার নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম সাহসী অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানগুলোর একটি।
তিনি জানান, উদ্ধার হওয়া সেনা একজন অভিজ্ঞ কর্নেল। বিমান ভূপাতিত হওয়ার সময় তিনি আহত হন, তবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন বলেই আশা করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনীর কেউ নিহত হয়নি বলেও দাবি করেন ট্রাম্প।
আরও একটি বিষয় তিনি উল্লেখ করেন—নিখোঁজ ক্রুর অবস্থান আগেই শনাক্ত করা গিয়েছিল, কিন্তু অভিযানের নিরাপত্তার কথা ভেবে তা প্রকাশ করা হয়নি।
ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষায়, কোনো সেনাকে পেছনে ফেলে না আসা মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি দীর্ঘদিনের নীতি।
তবে পুরো ঘটনাটি ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকরও বটে। কারণ এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে এবং তারা মার্কিন বিমানকে ঠেকাতে পারবে না। তার প্রতিরক্ষামন্ত্রীও বলেছিলেন, আকাশে যুক্তরাষ্ট্রেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
কিন্তু এই বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা দেখাচ্ছে, ইরান এখনও অন্তত কিছুটা সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
আরেকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, উদ্ধার অভিযানে কোনো হতাহত হয়নি। কিন্তু কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অভিযান চলাকালে মার্কিন বাহিনী গুলির মুখে পড়ে এবং কয়েকজন আহত হন, যদিও তারা নিরাপদে সরে আসতে পেরেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি নিখোঁজ ওই ক্রু ইরানের হাতে ধরা পড়তেন, তাহলে তা বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারত। এমন পরিস্থিতি ১৯৭৯ সালের ইরান জিম্মি সংকটের স্মৃতি আবার ফিরিয়ে আনতে পারত—যখন মার্কিন কূটনীতিকদের ৪৪৪ দিন আটকে রাখা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে, শেষ পর্যন্ত উদ্ধার সফল হলেও পুরো ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার বাস্তব চিত্রটাই আবার সামনে এনে দিয়েছে।

Social Plugin