ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবরোধ চলছে, তা এখনো বহাল আছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানের কর্মকর্তারা নাকি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে আবার আলোচনার পথ খুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শোনা যাচ্ছে, পরবর্তী দফার বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে পাকিস্তান।
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের প্রতিবাদে তেহরানে রাস্তায় নেমেছে হাজার হাজার মানুষ। তাদের এই বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘জলদস্যুতা’র অভিযোগ তুলেছে।
অন্যদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম ওয়াশিংটন ডিসিতে লেবানন ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য আলোচনাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। একই সময় ট্রাম্প পোপ লিও চতুর্দশের সমালোচনার জবাবে আরও কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তার ভাষায়, ইরানে যুদ্ধের বিরোধিতা করে পোপ ভুল করেছেন এবং অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছেন।
- সর্বশেষ পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
- এক সাক্ষাৎকারে হরমুজ প্রণালী অবরোধ করার দায়ে ভ্যান্স ইরানকে "অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদের" দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
- তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেমনটা দেখিয়ে দিয়েছেন, এই খেলায় দুপক্ষই অংশ নিতে পারে। ইরান যদি অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদে লিপ্ত হওয়ার চেষ্টা করে, তবে আমরাও একটি সাধারণ নীতি কঠোরভাবে মেনে চলব—আর তা হলো, ইরানের কোনো জাহাজকেও আর বাইরে বের হতে দেওয়া হবে না।"
- নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ২০ বছরের স্থগিতাদেশের ওপর জোর দিয়েছে।
- দক্ষিণ লেবাননের সংঘাত নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে মঙ্গলবার যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অংশ নেবেন।
- ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধের সময় তাদের এক সেনা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন।
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও শান্তি আলোচনার আশায় যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধির উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হওয়ায়, এশিয়ার বাজারে দিনের শুরুর বাণিজ্যে তেলের দাম কিছুটা কমেছে।
- জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলিদের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি এক ধরনের ক্লান্তিবোধ বা অনীহা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি এই অবরোধকে দেশের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোকেও অগ্রাহ্য করছে। গুতেরেস নিজেও সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে—যেখানে দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়—জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার বিষয়ে।
পাকিস্তানে আলোচনার চেষ্টা ভেস্তে যাওয়ার পরই সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর এই অবরোধ কার্যকর করে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এই নিয়ম সব দেশের জাহাজের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে—যেগুলো ইরানের বন্দর বা উপকূলে ঢুকছে বা সেখান থেকে বের হচ্ছে। তবে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অন্য দেশের বন্দরগামী জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।
এদিকে ওয়াশিংটন ডিসিতে আজ লেবানন ও ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা। দীর্ঘ কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার—কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও—দুই দেশের প্রতিনিধিরা সরাসরি মুখোমুখি বসতে যাচ্ছেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক মার্কো রুবিওও উপস্থিত থাকতে পারেন।
এই বৈঠকে মূলত দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা শুরু করা যায় কি না, তা নিয়ে কথা হবে। লেবানন প্রথমে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাতে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিতে চায়। কিন্তু ইসরায়েল সেই প্রস্তাব মানতে রাজি নয়; তাদের দাবি, ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীকে আগে নিরস্ত্র করতে হবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ আগেই জানিয়ে দিয়েছে, এই ধরনের কোনো আলোচনার ফল তারা মেনে নেবে না।
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক সংঘর্ষে লেবাননের অবস্থা খুবই নাজুক হয়ে পড়েছে। দশ লক্ষের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে, আর নিহতের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে—যাদের মধ্যে অনেক নারী, শিশু এবং স্বাস্থ্যকর্মীও আছেন।

Social Plugin