তিনি বলেন, “খারাপ খবরটা হলো, কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। তবে আমার মনে হয়, এটা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ক্ষতির।”
চুক্তি না করেই ফিরতে হচ্ছে—এ কথাও লুকোননি তিনি। তাঁর ভাষায়, “আমরা আমাদের অবস্থান খুব পরিষ্কার করে জানিয়েছি। কোথায় গিয়ে আর ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়, সেটাও বলেছি। তারপরও যখন মিলল না, তখন ফেরাই একমাত্র পথ।”
আলোচনার পুরো সময়জুড়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন বলেও জানান ভ্যান্স—কমপক্ষে ছয়বার।
লজিস্টিক বা পরিবহন সংক্রান্ত বাধা সত্ত্বেও ভারত থেকে চিকিৎসা সহায়তার দ্বিতীয় চালান পাঠানো হয়েছে বলে জানাল ইরান। ভারতে অবস্থিত ইরানের কূটনৈতিক মিশন শনিবার জানিয়েছে যে, ভারতের জনগণের দেওয়া অনুদানের অর্থে সংগৃহীত চিকিৎসা সামগ্রীর দ্বিতীয় একটি চালান এখন 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি'-র উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে; যদিও এর আগে চিকিৎসা সামগ্রীর একটি অপেক্ষাকৃত বড় চালান পাঠানোর প্রচেষ্টা নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছিল।চলতি মাসের শুরুর দিকে উদ্ভূত কিছু জটিলতার প্রেক্ষাপটেই এই অগ্রগতি সাধিত হলো। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত থেকে সংগৃহীত প্রায় ৪০ টন ওষুধ স্থানান্তরের একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া থমকে গিয়েছিল, কারণ ওই চালানটি গ্রহণ করতে নির্ধারিত 'মহান এয়ার'-এর একটি বিমান মাশহাদ বিমানবন্দরে চালানো এক বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ইসলামাবাদে হওয়া এই বৈঠকটা এমনিতেই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এক দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি বসেছিল মুখোমুখি, আর ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এটাই ছিল সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। শুধু কূটনৈতিক দিক থেকেই নয়, এর ফলাফলের ওপর ঝুলে আছে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ আর হরমুজ প্রণালী খুলবে কি না—সেটাও।
এই প্রণালীটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা নতুন করে বলার দরকার নেই—বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই পথ দিয়েই যায়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এটাকে আটকে রাখায় তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে, আর প্রাণহানিও হয়েছে হাজারে হাজারে।
আলোচনা শেষ হলেও দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ইরান সরকার ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে জানায়, টেকনিক্যাল টিমগুলোর মধ্যে নথিপত্র আদান-প্রদান চলবে। কিছু মতপার্থক্য রয়ে গেলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছে তারা—যদিও কবে আবার বসা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তানের একটি সূত্র বলছে, শেষ দফায় ভ্যান্স, স্টিভ উইটকফ আর জ্যারেড কুশনার ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেন। তারপরই একটা বিরতি আসে।
শুরু থেকেই আলোচনার পরিবেশটা খুব স্থির ছিল না। কখনো টানটান উত্তেজনা, কখনো একটু নরম—এই ওঠানামা চলেছেই, বলছে আরেকটি সূত্র।
নিরাপত্তার দিক থেকেও ইসলামাবাদ তখন কার্যত অবরুদ্ধ শহর। লাখ লাখ মানুষের এই শহরে রাস্তায় রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পাকিস্তানের জন্য এই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা বেশ বড় এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত—এক বছর আগেও যে দেশকে অনেকেই কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা বলে ভাবত।
এদিকে, আলোচনার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে। তাদের দাবি, ইতিমধ্যে দুটি যুদ্ধজাহাজ ওই পথ অতিক্রম করেছে এবং মাইন সরানোর প্রস্তুতিও চলছে। যদিও ইরান এই দাবি একেবারেই উড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক দিকটাও আলোচনায় এসেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বিদেশে আটকে থাকা সম্পদ ছাড়ের কথা বলা হলেও, যুক্তরাষ্ট্র সেটি অস্বীকার করেছে।
ইরানের দাবির তালিকাও কম বড় নয়—হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ, অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধবিরতি, এমনকি এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াতে ফি আদায়ের কথাও তারা তুলেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য এখন কিছুটা বদলালেও দুটো বিষয় পরিষ্কার—হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে, আর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এমনভাবে সীমাবদ্ধ করতে হবে যাতে তারা কোনোভাবেই বোমা বানাতে না পারে।

Social Plugin