যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি: শর্তগুলো কী এবং এরপর কী হতে যাচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে আপাতত দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধ থামানোর একটা সমঝোতা হয়েছে। প্রায় ৪০ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের টানা হামলায় পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে, পুরো অঞ্চলটাই বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই জায়গা থেকেই আপাতত একটু থামার সুযোগ মিলল।

এই যুদ্ধবিরতিটা হয়েছে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায়। তার আগে যা চলছিল, তা কার্যত টানা পাল্টাপাল্টি হামলা—বিমান থেকে আঘাত, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া, একের পর এক হুমকি। উপসাগরীয় এলাকায় এমন মাত্রার উত্তেজনা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যেও, বিশেষ করে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বেশ ব্যাহত হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কাও তখন বাড়ছিল।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ বলেন, দুই পক্ষই পরিস্থিতি বুঝে কিছুটা সংযম দেখিয়েছে এবং আলোচনার পথে থাকার চেষ্টা করেছে।

ইরানও জানায়, এই দুই সপ্তাহ তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আবার চালু করতে দেবে। এই পথটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বের বড় একটা অংশের তেল-গ্যাস এই রুট দিয়ে যায়। আগে ইরান এই পথ বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে ইসরায়েলও বলেছে, আপাতত তারা হামলা বন্ধ রাখবে।

তবে সবকিছু এত সহজ নয়। ‘ব্যাপক চুক্তি’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, সেটা নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের অবস্থান আলাদা। তার ওপর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত আর কুয়েত থেকে নতুন হামলার খবর এসেছে। ফলে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে—এই বিরতি কতটা টিকবে। এই চুক্তির পরিধি আর বাস্তবায়ন নিয়ে এখনও অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে। তার কথায়, সব পক্ষই নিজেদের জয় দাবি করছে, কিন্তু বাস্তবে সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি।  চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। যেমন, এটা লেবাননের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না—তা নিয়েই মতভেদ আছে। ইসরায়েল বলছে প্রযোজ্য নয়, আর পাকিস্তান বলছে হবে।

চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র অন্তত দুই সপ্তাহ ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক হামলা বন্ধ রাখবে। ওয়াশিংটনের দাবি, তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছে, আর ইরান হরমুজ প্রণালী আবার খুলতে রাজি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষের জবাব হিসেবেই ইরান ওই পথ বন্ধ করেছিল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান তাদের কাছে ১০ দফার একটা প্রস্তাব দিয়েছে, যেটাকে তিনি আলোচনার ভালো ভিত্তি বলে মনে করছেন। তার দাবি, বেশিরভাগ বড় মতভেদে ইতিমধ্যেই কিছুটা মিল এসেছে, আর দুই সপ্তাহ সময় পেলে একটা পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।

তিনি এটাও বলেছেন যে, চীন ইরানকে আলোচনায় আনতে সাহায্য করেছে, আর তুরস্ক ও মিশরও সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যস্থতায় ভূমিকা রেখেছে। তবে পরে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, প্রকাশ্যে যে ১০ দফার কথা এসেছে, সেটাই আসল আলোচনা নয়।

তার ভাষায়, প্রস্তাবগুলো ভালো, অনেক বিষয়েই অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু এগুলো ইরানের সর্বোচ্চ দাবি নয়। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, আলোচনা ভেস্তে গেলে খুব সহজেই আবার সংঘাতের পথে ফিরে যাওয়া সম্ভব।

পিনফোল্ড মনে করেন, এই পরিস্থিতি অনেকটা গাজা নিয়ে আগের শান্তি পরিকল্পনার মতো—কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তবে মাঝেমধ্যেই তা ভাঙা হচ্ছে। তার মতে, আপাতত সবাই মতভেদ রেখেই এগোতে রাজি হয়েছে, অনেক জটিল বিষয় পরে তোলার জন্য রেখে দিয়েছে। ফলে ঠিক কে কোন বিষয়ে রাজি হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এখনো পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসন ১০ দফা প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে কিছু বলেনি। এর মধ্যে আছে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত দেওয়া, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, কিংবা অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা সরানো।

তবে পরে ট্রাম্প কিছুটা কড়া অবস্থান নেন। তিনি বলেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ড্যান কেইন জানিয়েছেন, নির্দেশ পেলেই আবার হামলা শুরু করার জন্য তারা প্রস্তুত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছেন, ইরান চুক্তি ঠিকমতো মানছে কি না, তা নজরে রাখা হচ্ছে।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে এই চুক্তিতে তেমন কিছু বলা হয়নি। অথচ আগে যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, ইরান এই কর্মসূচি কমাক বা বন্ধ করুক। ইরান অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই বিষয়টা তারা আলোচনার টেবিলে আনতে রাজি নয়।