একই মরসুমে ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের সেরা ক্লাব হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল আর্সেনাল। ২২ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কয়েক দিন আগেই প্রিমিয়ার লিগ জিতেছিল মিকেল আর্তেতার দল। কিন্তু ইউরোপের সর্বোচ্চ মঞ্চে এসে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে শেষ পর্যন্ত প্যারিস সঁ জরমঁর কাছে হার মেনে রানার্স হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল লন্ডনের ক্লাবটিকে।
নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে স্কোরলাইন ছিল ১-১। এরপর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, আর সেখানেই বাজিমাত করে ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য আর্সেনালের পক্ষেই গিয়েছিল। প্রথমার্ধে কাই হাভার্ৎজ়ের গোলে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ডের দল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে সমতা ফেরায় পিএসজি। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে যে দল প্রথম গোল করেছে, তারাই শিরোপা জিতেছে। কিন্তু বুদাপেস্টের এই ফাইনালে সেই পরিসংখ্যান আর সত্যি রইল না।
ম্যাচের বড় অংশ জুড়ে বলের দখল ও আক্রমণের নিয়ন্ত্রণ ছিল পিএসজির হাতে। গোল পাওয়ার পর আর্সেনাল অনেকটাই রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে। সেই সুযোগই কাজে লাগায় লুই এনরিকের দল। শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সিংহাসন ধরে রাখার পাশাপাশি টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের কীর্তিও গড়ে তারা। এই নজির এতদিন ছিল শুধুই রিয়াল মাদ্রিদের দখলে।
টাইব্রেকারে প্রথম শট থেকেই শুরু হয় উত্তেজনা। পিএসজির হয়ে গনসালো রামোস গোল করেন। জবাবে আর্সেনালের ভিক্টর গিয়োকেরেসও লক্ষ্যভেদ করেন। এরপর ডেজিরে ডুয়ে এবং আর্সেনালের দ্বিতীয় শট নিতে আসা এবে এজ়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়। ডুয়ে গোল করলেও এজ়ের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পিএসজির সমর্থকদের গর্জনের মধ্যে চাপটা সামলাতে পারেননি তরুণ মিডফিল্ডার।
তবে আর্সেনালের আশা তখনও শেষ হয়ে যায়নি। নুনো মেন্ডেসের শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ডেভিড রায়া। ফলে আবার সমতায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়। ডেকলান রাইস ঠান্ডা মাথায় গোল করেন, অন্যদিকে আশরফ হাকিমিও নিজের দায়িত্ব নিখুঁতভাবে পালন করেন। গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলির গোল আর্সেনালকে লড়াইয়ে রাখলেও বেরাল্ডোর সফল শটের পর চাপ গিয়ে পড়ে গ্যাব্রিয়েলের কাঁধে।
গোল করলেই টাইব্রেকার চলত আরও। কিন্তু সেই মুহূর্তে স্নায়ুর চাপ সামলাতে পারেননি আর্সেনালের সেন্টার-ব্যাক। তাঁর শট বারের অনেক উপর দিয়ে উড়ে যায়। আর তাতেই ৪-৩ ব্যবধানে টাইব্রেকার জিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি নিজেদের দখলে রাখে পিএসজি।
ফাইনালের প্রথমার্ধ দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছিল, এ কি সেই আর্সেনাল যারা ২২ বছর পর প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে? এ কি সেই দল যারা অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পৌঁছেছিল?
শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় তোলে পিএসজি। অন্যদিকে আর্সেনাল যেন অপেক্ষা করছিল প্রতি-আক্রমণের সুযোগের জন্য। আর সেই কৌশলেই প্রথম সাফল্য আসে তাদের।
ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে পিএসজির রক্ষণভাগের ভুলে বল পেয়ে যান কাই হাভার্ৎজ়। আশপাশে কোনও সতীর্থ না থাকায় নিজেই এগিয়ে গিয়ে প্রথম পোস্টের দিকে তীব্র কোণাকুণি শট নেন। পিএসজির গোলরক্ষক সাপানভ ভেবেছিলেন বল মাটি ঘেঁষে আসবে। সেই অনুমান ভুল প্রমাণ করে তাঁর মাথার উপর দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন জার্মান ফরোয়ার্ড।
গোল পাওয়ার পরই অবশ্য খেলার রং বদলে যায়। সামনে একমাত্র হাভার্ৎজ়কে রেখে প্রায় পুরো দল নেমে আসে নিজেদের অর্ধে। অনেকটা ‘পার্ক দ্য বাস’ কৌশলেই খেলতে শুরু করে আর্সেনাল। ফলে একের পর এক আক্রমণ গড়ে তুললেও প্রথমার্ধে গোলের দেখা পাচ্ছিল না পিএসজি।
তবে ফরাসি দলও একটি জায়গায় বারবার একই ভুল করছিল। তাদের অধিকাংশ আক্রমণ তৈরি হচ্ছিল ডান প্রান্ত ধরে। আশরফ হাকিমি, উসমান দেম্বেলে এবং ভিতিনিয়ার সমন্বয়ে সেই দিকটাই বেশি ব্যবহার হচ্ছিল। অথচ বাঁ প্রান্তে থাকা খভিচা কাভারাত্সখেলিয়াকে তুলনামূলকভাবে কম খেলানো হচ্ছিল। অনেক সময় ফাঁকায় থাকলেও বল পাচ্ছিলেন না জর্জিয়ান তারকা। ফলে আক্রমণে বৈচিত্র্যের অভাব দেখা দেয়।
প্রথমার্ধে প্রায় ৭৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেও গোল করতে ব্যর্থ হয় পিএসজি। অন্যদিকে একমাত্র বড় সুযোগ থেকেই গোল তুলে নিয়ে ১-০ ব্যবধানে বিরতিতে যায় আর্সেনাল। তবে ম্যাচের শেষ হাসি যে প্যারিসের ক্লাবই হাসবে, তখনও তা বোঝা যায়নি।

Social Plugin