বৃষ্টি-তুষারপাতে বিপর্যস্ত কেদারনাথ যাত্রা, চরম দুর্ভোগে বাংলার পর্যটকরা; লাগামছাড়া হোটেল ভাড়া ও পরিবহণ খরচে ক্ষোভ

কেদারনাথ দর্শনে গিয়ে চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন বাংলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও পর্যটক। টানা বৃষ্টি এবং ভারী তুষারপাতের জেরে উত্তরাখণ্ডের একাধিক এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রশাসন আপাতত কেদারনাথ যাত্রা স্থগিত রেখেছে। কিন্তু যাঁরা ইতিমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন, তাঁদের থাকার ব্যবস্থা, যাতায়াত কিংবা ন্যূনতম পরিষেবা নিয়েই দেখা দিয়েছে বিস্তর সমস্যা।

পূর্ব বর্ধমানের বেশ কয়েকজন পর্যটক বর্তমানে ওই এলাকায় আটকে রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, আবহাওয়ার অবনতি হলেও পর্যটকদের জন্য কোনও সুসংগঠিত ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। ফলে হোটেল ভাড়া রাতারাতি দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। কোথাও ১২ ঘণ্টার জন্য আট থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে, মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পথ যেতে ট্রেকার বা ছোট গাড়ির জন্য ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

পর্যটকদের আরও অভিযোগ, শোনপ্রয়াগ থেকে গৌরীকুণ্ড পর্যন্ত যাওয়ার পথে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ নেই। বিপুল সংখ্যক যাত্রীকে পাঠানো হলেও রেজিস্ট্রেশন যাচাই বা ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ি পথে ওঠানামার জন্য আলাদা রাস্তা না থাকায় একই সংকীর্ণ পথে যাত্রীদের ওঠা-নামা করতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে।

বর্তমানে কেদারনাথ এলাকায় অবস্থান করছেন দেবী সরকার। রবিবার ফোনে তিনি বলেন, “এত বড় তীর্থযাত্রায় এমন অব্যবস্থা থাকবে, তা কল্পনাও করিনি। হাজার হাজার মানুষ গৌরীকুণ্ডের দিকে যাচ্ছেন, কিন্তু নিরাপত্তা বা ভিড় সামলানোর কোনও কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। রাস্তা এতটাই সরু যে যেকোনও সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও নেই। হোটেল মালিকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া নিচ্ছেন। পরিবহণেরও অভাব রয়েছে। হেলিকপ্টারের টিকিট পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। এমনকি অনলাইনে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। সব মিলিয়ে অত্যন্ত খারাপ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে হবে।”

একই অভিযোগ করেছেন আর এক পর্যটক মলিনা রায়। তাঁর কথায়, “অনেক খরচ করে চারধাম যাত্রায় এসেছি। আমরা যখন কেদারনাথ পৌঁছই, তখন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু তার আগে কোনও সতর্কবার্তা পাইনি। শোনপ্রয়াগ থেকে গৌরীকুণ্ড পর্যন্ত পৌঁছতে ভয়াবহ যানজটের মধ্যে পড়তে হয়েছে। কেদারনাথেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে। এত মানুষের ভিড়, অথচ পর্যাপ্ত খাবার, পানীয় জল বা চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে কী হবে, সেই উত্তরও কারও কাছে নেই। প্রশাসনের আরও সতর্ক এবং প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল।”

পর্যটকদের দাবি, যাত্রাপথে কোথায় কখন যাওয়া যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। হঠাৎ করে নির্দেশ আসছে, আবার কখনও যাত্রা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোনো সম্ভব হচ্ছে না। পাহাড়ি সরু পথে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা বিশেষ করে প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

এই সময় চারধাম যাত্রাকে কেন্দ্র করে দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থী উত্তরাখণ্ডে পৌঁছেছেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেকেই এখন কার্যত আটকে পড়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু হোটেল মালিক ও পরিবহণ ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন। ক্ষুব্ধ পর্যটকদের একাংশের দাবি, প্রশাসনের আরও দ্রুত এবং কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। তা হলে এত মানুষের দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।