বৃহস্পতিবার সকাল আটটা। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের মাথায় দাঁড়িয়ে একসঙ্গে ধ্বনিত হল ‘বন্দে মাতরম’। সেই মুহূর্ত শুধু একটি সফল পর্বতারোহণের নয়, ভারতীয় নারীশক্তির এক গর্বের অধ্যায়েরও সাক্ষী হয়ে থাকল। প্রথমবারের মতো সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর সর্বমহিলা অভিযাত্রী দল এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস গড়ল।
বিএসএফ-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই অভিযানের নাম রাখা হয়েছিল ‘মিশন বন্দে মাতরম’। সেই মিশন সফল করে শীর্ষে পৌঁছন চার মহিলা কনস্টেবল। তাঁরা হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুনমুন ঘোষ, লাদাখের কওসর ফতিমা, উত্তরাখণ্ডের রেবেকা সিং এবং কার্গিলের সেরিং চোরোল। দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠোর প্রশিক্ষণ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াইয়ের পর তাঁদের এই সাফল্য বাহিনীর ইতিহাসে নতুন মাইলফলক হয়ে রইল।
শুধু বিএসএফ নয়, ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ বা আইটিবিপি-র তরফেও একটি মহিলা দল এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেয়। ১১ জন মহিলা সদস্য এবং তিন জন সহায়ক কর্মী নিয়ে গঠিত সেই দল বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৫২ মিনিটে নেপালের দিক থেকে এভারেস্ট শৃঙ্গে পৌঁছয়। দুই বাহিনীর এই সাফল্যকে দেশের জন্য গর্বের মুহূর্ত বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
তবে এভারেস্ট অভিযানের আনন্দের মাঝেও নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শৃঙ্গজয়ের পর ফেরার পথে প্রাণ হারিয়েছেন দুই ভারতীয় পর্বতারোহী অরুণ তিওয়ারি ও সন্দীপ আরে। শুক্রবার নেপাল প্রশাসন তাঁদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। জানা গিয়েছে, চূড়া থেকে নামার সময় শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয় দু’জনেরই।
নেপালের এক্সপেডিশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ঋষি ভাণ্ডারি জানিয়েছেন, শেরপারা যথাসাধ্য চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। অরুণ তিওয়ারির মৃত্যু হয় হিলারি স্টেপের কাছে, আর সন্দীপ আরে মারা যান ক্যাম্প-২-এর আশপাশে।
এদিকে এভারেস্ট অভিযানে বাংলার সাফল্যের তালিকায় আরও একটি নাম যোগ হয়েছে। পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থানার মাথুরি গ্রামের বাসিন্দা লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডল এক বছরের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার এভারেস্ট জয় করেছেন। তিনি বর্তমানে বিএসএফ-এর ব্যারাকপুরের ৩ নম্বর ব্যাটালিয়নে কর্মরত।
গত ২১ মে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে ওঠেন। বৃহস্পতিবার রাতে ক্যাম্প-২-এ পৌঁছনোর পর শুক্রবার সকালে নিরাপদে ক্যাম্প-১-এ নেমে আসেন। গত বছর ১৯ মে প্রথমবার এভারেস্ট জয় করেছিলেন লক্ষ্মীকান্ত। তাঁর এই নতুন সাফল্যের খবর পরিবার পায় শুক্রবার। ভাই শ্রীকান্ত মণ্ডল জানান, খবর পাওয়ার পর গোটা পরিবার আনন্দে আত্মহারা।
দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন লক্ষ্মীকান্ত। পাশাপাশি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ কোর্সও সম্পন্ন করেছেন তিনি। এর আগে ২০২৪ সালে ৭,০৭৭ মিটার উচ্চতার মাউন্ট কুন এবং ৬,৯৪০ মিটার উচ্চতার পিনাকেল শৃঙ্গ জয় করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এদিন এভারেস্টের উঁচু ক্যাম্পগুলি থেকে প্রায় ৫০০ কেজি বর্জ্য সংগ্রহ করে নামচে বাজারে নামিয়ে আনা হয়। পরিবেশ রক্ষার এই উদ্যোগও পর্বতারোহণ জগতের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
একদিকে নারীদের ঐতিহাসিক সাফল্য, অন্যদিকে দুই অভিযাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু। এভারেস্টের এবারের অভিযান তাই গৌরব, সংগ্রাম, সাফল্য এবং বেদনার এক বিরল মিশ্র স্মৃতি হয়ে রইল।

Social Plugin