রাজনৈতিক মহলে অনেক দিন ধরেই জল্পনা চলছিল। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে সামনে এল, তা অনেককেই বিস্মিত করেছে। সোমবার দিল্লিতে একদিকে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠক চলছিল, ঠিক সেই সময় রাজধানীর ৯, মোতিলাল নেহরু মার্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে জমেছিল অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। আর সেই বৈঠককে ঘিরেই শুরু হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের ভিতরে বড়সড় ভাঙনের জল্পনা।
সূত্রের দাবি, বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দিল্লির ক্ষমতার করিডরে এ যেন ‘পদ্ম অভিযান’-এর আরও পরিণত সংস্করণ। কারণ, এই বৈঠকের পর থেকেই তৃণমূলের একাধিক সাংসদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রবিবার চার্টার্ড বিমানে দুই সাংসদকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি পৌঁছেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তখনও দলের লোকসভা সদস্যদের সংখ্যা নিয়ে তাঁর হিসাব ছিল স্বস্তিদায়ক। কিন্তু মাত্র একদিনের মধ্যেই সেই সমীকরণ বদলে যায় বলে রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। জানা গিয়েছে, ২০ জনেরও বেশি তৃণমূল সাংসদের স্বাক্ষর-সম্বলিত একটি চিঠি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে জমা পড়েছে, যেখানে তাঁরা আলাদা সংসদীয় ব্লক গঠন করে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিদ্রোহী শিবিরের এক সাংসদের দাবি, সেই সংখ্যা ২২-এরও বেশি হতে পারে।
দিনভর রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনের বৈঠক। সেখানে লোকসভার একাধিক তৃণমূল সাংসদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন সদ্য রাজ্যসভা ও দল থেকে ইস্তফা দেওয়া সুখেন্দুশেখর রায়। বিজেপির পক্ষ থেকে ছিলেন ভূপেন্দ্র যাদব, নিশিকান্ত দুবে, বিপ্লব দেব এবং অন্ধ্রপ্রদেশের সাংসদ সি এম রমেশ। তৃণমূলের অসন্তুষ্ট সাংসদদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব বিজেপি রমেশের হাতেই দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বৈঠক শেষ হওয়ার পরই তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং আগামী কয়েক দিনে একাধিক সাংসদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও সূত্রের খবর।
বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজনের দাবি, সেখানে তৃণমূলের অসন্তুষ্ট সাংসদরা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন যে তাঁরা আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে থাকতে আগ্রহী নন। তবে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের জটিলতা এড়াতে আপাতত সাংসদ পদ ছাড়ার পথে হাঁটছেন না তাঁরা। পরিবর্তে লোকসভায় পৃথক ব্লক গঠন করে এনডিএকে সমর্থনের কৌশল নেওয়া হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন কাকলি ঘোষদস্তিদার। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে তাঁকে মুখ্য সচেতকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে, লোকসভার নথিতে এখনও সেই পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়নি। ফলে সাংবিধানিকভাবে এখনও তিনি দলের মুখ্য সচেতক হিসেবেই বিবেচিত। সেই পদাধিকারেই স্পিকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে নতুন ব্লকের পক্ষ থেকে এনডিএর সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছার কথা জানানো হয়েছে বলে দাবি বিদ্রোহী শিবিরের।
তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পিকারের দফতর ওই চিঠি পাওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। অন্যদিকে তৃণমূলও জানিয়েছে, কাকলিকে মুখ্য সচেতকের পদ থেকে অপসারণের চিঠি ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সোমবারের রাজনৈতিক নাটকের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় সন্ধ্যায়। দিল্লির তিলক মার্গে সাংসদ শতাব্দী রায়ের সরকারি বাসভবনে বসে আরেক দফা বৈঠক। সেখানেও হাজির হন শুভেন্দু অধিকারী। মূল আলোচনার বিষয় ছিল এই নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ রূপরেখা।
সূত্রের খবর, বিদ্রোহী শিবিরের মধ্যেই নেতৃত্ব নিয়ে কিছু মতভেদ তৈরি হয়েছে। কাকলি ঘোষদস্তিদারকে সামনে রেখে এগোনোর বিষয়ে সবাই একমত নন। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতেই শুভেন্দু অধিকারীর সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায় বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের।
এদিকে এই নতুন ব্লকের শক্তি আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তৃণমূলের আরও কয়েকজন সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও দলের বর্ষীয়ান নেতা সৌগত রায় জানিয়েছেন, তাঁর কাছেও বিজেপি নেতাদের ফোন এসেছিল, কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি। তাঁর দাবি, ২০ জনের বেশি সাংসদ একজোট হওয়ার যে কথা প্রচার করা হচ্ছে, তা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না।
তবু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের অন্দরে অসন্তোষের যে স্রোত তৈরি হয়েছে, তা আর অস্বীকার করার জায়গায় নেই। লোকসভার পর এখন রাজ্যসভাকেও ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বর্তমানে দুটি সম্ভাবনার কথা সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। প্রথমত, বিদ্রোহী সাংসদদের সংখ্যা যদি পর্যাপ্ত হয়, তাহলে তাঁদের সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করানোর চেষ্টা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, পৃথক সংসদীয় ব্লককে ‘আসল তৃণমূল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৌশলও নেওয়া হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি এনডিএর জোট-নির্ভরতাও অনেকটাই কমে যেতে পারে।
দিল্লির এই ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা সময়ই বলবে। তবে সোমবারের রাজনৈতিক অঙ্ক যে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি বাংলার রাজনীতিতেও নতুন আলোড়ন তুলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Social Plugin