পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের এক মাসের মধ্যেই রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করল। বহুদিনের জট কাটিয়ে অবশেষে পশ্চিমবঙ্গ যুক্ত হল ‘আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা’-র সঙ্গে। সোমবার নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নাড্ডা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে এই সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হয়।
এর ফলে রাজ্যের প্রায় ১ কোটি ৪৩ লক্ষ পরিবার দেশের প্রায় ৪২ হাজার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বছরে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সম্পূর্ণ নগদহীন চিকিৎসার সুবিধা পাবে। চলতি অর্থবর্ষে এই প্রকল্পের জন্য পশ্চিমবঙ্গকে ৯৭৬ কোটি টাকা দেবে কেন্দ্র।
তবে শুধু আয়ুষ্মান ভারত চালুই নয়, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে কার্যত অচল হয়ে থাকা একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে সাধারণ মানুষের নাম নথিভুক্তিকরণ এবং পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে নতুন সরকার। সেই লক্ষ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ‘দুয়ারে সরকার’-এর আদলে চালু করা হচ্ছে নতুন কর্মসূচি—‘জনকল্যাণ শিবির’।
রাজ্য সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই শিবির আয়োজন করা হবে। ৬ জুন মুখ্যসচিবের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় প্রতি সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েতের জন্য একটি এবং শহরাঞ্চলে প্রতি দশটি ওয়ার্ডের জন্য একটি করে শিবির বসবে। কলকাতার মতো বৃহৎ পুরসভাগুলিতে বোরোভিত্তিক শিবির আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিন দিনের এই কর্মসূচিতে রাজ্যজুড়ে প্রায় ২৩০০টি শিবির অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
শুধু কেন্দ্রীয় প্রকল্প নয়, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পেও এই শিবিরের মাধ্যমে নাম নথিভুক্তি করা যাবে। আবেদন, তথ্য যাচাই, পরিষেবা প্রদান এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি—সবকিছুর ব্যবস্থাই থাকবে এক ছাদের নিচে।
আগের সরকারের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি ৪ লক্ষ পরিবার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আয়ুষ্মান ভারতে সেই সংখ্যা কিছুটা কম হলেও রাজ্যের আশা কর্মীদের এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি, অন্য রাজ্যে বসবাসকারী পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দারাও এই স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পাবেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নাড্ডা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আয়ুষ্মান ভারত চালু না করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন কেন্দ্রের অনুরোধ সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে প্রকল্পটি কার্যকর করা হয়নি। সেই প্রসঙ্গেই তিনি রাজনৈতিক মন্তব্যও করেন।
বিজ্ঞান ভবনের অনুষ্ঠানে কেন্দ্র ও রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব পূণ্য সলিলা শ্রীবাস্তব, পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম এবং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকেন। দিল্লি সফরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এবং ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্যের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর আয়ুষ্মান ভারত ছাড়াও ১২৫ দিনের কাজ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা, প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা, বিশ্বকর্মা যোজনা এবং প্রধানমন্ত্রী কর্মসংস্থান গ্যারান্টি প্রকল্প-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় কর্মসূচি নতুন করে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকর্মা যোজনার জন্য জমা পড়া প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ আবেদন গত তিন বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন দপ্তরে আটকে রয়েছে। সেই আবেদনগুলি ধাপে ধাপে যাচাই করে কেন্দ্রের কাছে পাঠানো হবে। জনকল্যাণ শিবিরে এই যাচাইয়ের কাজও করা হবে।
এ ছাড়া অন্নপূর্ণা যোজনা, কন্যাশ্রী-সহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে নতুন আবেদন গ্রহণ, নথি সংশোধন, তথ্য যাচাই এবং পরিষেবা প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে। আগের ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচির কয়েকটি জনপ্রিয় পরিষেবাও বজায় রাখা হচ্ছে।
পুরো কর্মসূচি পরিচালনার জন্য একটি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি পোর্টাল তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত জারি করা হবে প্রয়োজনীয় পরিচালন বিধি। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্তরে কমিটি ও টাস্ক ফোর্স গঠন করে প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন।

Social Plugin