সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইউনিয়ন রুম থেকে অস্ত্র ও পচে যাওয়া বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড়। এই মামলায় তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ব্যবসায়ী পরিতোষ দত্তকে গ্রেপ্তার করেছে লালবাজারের গোয়েন্দারা। বৃহস্পতিবার ভোররাতে পূর্ব বর্ধমান থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পরে কলকাতায় এনে ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হলে আদালত তাঁকে পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
তদন্তকারীদের দাবি, কলেজের আর্থিক লেনদেন এবং অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পরিতোষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পলাতক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর ছেলের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
কয়েকদিন আগে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইউনিয়ন রুমে তল্লাশি চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র এবং দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উদ্ধার করে মুচিপাড়া থানার পুলিশ। এরপরই অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের হয় দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও পরিতোষ দত্তের বিরুদ্ধে।
তদন্তে উঠে এসেছে, কলেজে বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিতোষ দত্ত ছিলেন দেবাশিসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অভিযোগ, কলেজ কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া ছিল যে পরিতোষ ছাড়া অন্য কোনও সরবরাহকারীর কাছ থেকে জিনিসপত্র কেনা যাবে না। নিয়মমাফিক দরপত্র বা টেন্ডার ছাড়াই বহু ক্ষেত্রে তাঁর সংস্থার কাছ থেকেই কেনাকাটা করা হতো।
তদন্তকারীদের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, শুধু যে তিনি প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করতেন তা-ই নয়, এমন কিছু পণ্যেরও বিল জমা পড়েছে যেগুলির ব্যবসার সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক ছিল না। আরও গুরুতর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে সরবরাহ করা সামগ্রীর প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি টাকার বিল জমা দেওয়া হতো এবং সেই বিল কলেজ কর্তৃপক্ষ মিটিয়েও দিত।
গোয়েন্দাদের সন্দেহ, অতিরিক্ত অর্থের একটি বড় অংশ পরে ঘুরপথে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পৌঁছত। এমন অভিযোগও সামনে এসেছে যে, কাগজে-কলমে সামগ্রী সরবরাহ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেই জিনিস কলেজে পৌঁছয়নি। অথচ তার সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে।
অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসার পর থেকেই পরিতোষ দত্ত গা-ঢাকা দেন। তদন্তে জানা যায়, তাঁর বাড়ি পূর্ব বর্ধমানে। সেই সূত্র ধরেই সেখানে পৌঁছে তাঁকে গ্রেপ্তার করে লালবাজারের তদন্তকারী দল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পরিতোষ দাবি করেছেন, ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বর্ধমানে চলে যেতে বলেন। সেই পরামর্শ মেনেই তিনি কলকাতা ছেড়ে সেখানেই আত্মগোপন করেছিলেন।
তদন্তকারীদের মতে, দেবাশিসের হাত ধরেই কলেজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। জেরায় পরিতোষ আরও স্বীকার করেছেন বলে দাবি পুলিশের, কলেজ প্রাঙ্গণে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা থাকত সে বিষয়েও তাঁর জানা ছিল।
এদিকে আর্থিক অনিয়মের তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। গোয়েন্দাদের ধারণা, কলেজে সরবরাহের কাজের বরাত পাওয়ার পর পরিতোষ দত্ত অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল অর্থ উপার্জন করেন। সেই টাকায় তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তিও কিনেছেন বলে তদন্তে ইঙ্গিত মিলছে।
শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, অভিযোগ রয়েছে যে কলেজের অভ্যন্তরে বিরোধী রাজনৈতিক মতের ছাত্রনেতা বা কর্মীদের ভয় দেখানোর ক্ষেত্রেও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করা হতো। সেই ঘটনাগুলিতেও পরিতোষ দত্তের ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, এই চক্রের আর কারা কারা যুক্ত ছিলেন এবং কলেজের অর্থ কোথায় কোথায় গিয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব সামনে আনা। পাশাপাশি পলাতক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ছেলেকে খুঁজে বের করার চেষ্টাও জোরদার করা হয়েছে।

Social Plugin