ইরানের মানুষের এখনকার দিনগুলো যেন একসঙ্গে কয়েকটা চাপের নিচে আটকে আছে। একদিকে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলের সঙ্গে উত্তেজনা আর হামলা-পাল্টা হামলা, অন্যদিকে ভেঙে পড়া অর্থনীতি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে চলা ইন্টারনেট বন্ধ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফার্সি নববর্ষ নওরোজ উপলক্ষে এই সময় সাধারণত দেশজুড়ে ছুটির আমেজ থাকে। কিন্তু এবার সেই চেনা ছবিটা নেই। গত এক বছরে একের পর এক ঘটনায় মানুষের স্বাভাবিক জীবন বারবার থমকে গেছে। জুনে ইসরাইল আর আমেরিকার সঙ্গে স্বল্প সময়ের যুদ্ধ, জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভ, আর জ্বালানি সংকটের কারণে দূষণ—সবকিছু মিলিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা লেগেই আছে।
ব্যবসায়ীদের অবস্থা আরও খারাপ। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের এক কাপড় ব্যবসায়ী বলছিলেন, নওরোজের আগে সাধারণত ভালো বিক্রি হয়, কিন্তু এবার সেটা একেবারেই হয়নি। তার ভাষায়, আগের তুলনায় বিক্রি নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। ছুটির পর কী হবে, সেটাও কেউ ঠিক করে বলতে পারছেন না। নিরাপত্তার কারণে তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
ইরানের অর্থনীতির অবনতি অবশ্য নতুন কিছু না। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের নীতি, তার সঙ্গে দেশের ভেতরের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেকদিন ধরেই কমছে। যুদ্ধের আগেই মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছেছিল, খাবারের দাম তো অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। বাজারে পণ্য থাকলেও দাম এত বেশি যে, মানুষ কিনতে গিয়ে বারবার হিসাব কষছে। যুদ্ধের ভয়েও অনেক পরিবার তেহরান ছেড়েছে, তাদের সঞ্চয়ও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি এসেছে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। টানা প্রায় ২৫ দিন ধরে কোটি কোটি মানুষ কার্যত বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন। শুধু যোগাযোগই না, এতে ছোট ব্যবসা, বিশেষ করে অনলাইনে যারা কাজ করতেন, তারা একেবারে বিপদে পড়েছেন। ইনস্টাগ্রামে গয়না বিক্রি করা এক তরুণী বলছিলেন, কবে ইন্টারনেট ফিরবে, কেউ কিছু জানায় না। তার কথায়, এতে শুধু অপমানই না, জীবিকাও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে দমন-পীড়নের কারণে। বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানানোর অভিযোগে অনেক ব্যবসার অনলাইন পেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এমনকি কারও কারও সম্পদও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। বিদেশে থাকা কিছু পরিচিত মুখকেও ‘শত্রু রাষ্ট্রের সহযোগী’ বলা হচ্ছে। এমনকি যুদ্ধের ভিডিও বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত দৃশ্য বাইরে পাঠানোর অভিযোগে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। সম্প্রতি এক তরুণীকে টেলিভিশনে জোর করে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছে—তার অপরাধ ছিল নিজের বাসার জানালা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও করা।
এদিকে, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ সরাসরি সতর্ক করে দিয়েছে, কেউ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলে তাকে শত্রু হিসেবে দেখা হবে। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষ এক ধরনের অজানা ভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। বাইরে যুদ্ধের চাপ, ভেতরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

Social Plugin