টালিউডের জনপ্রিয় মুখ রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই—খবরটা যেন হঠাৎ করেই সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। রবিবার, ২৯ মার্চ সন্ধ্যার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪২। প্রথমে যা জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ-ওড়িশা সীমান্তের তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং করতে গিয়েই এই দুর্ঘটনা।
ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক যে এখনও অনেকেই ঠিক মেনে নিতে পারছেন না। ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মী থেকে শুরু করে দর্শক—সবাই শোকে স্তব্ধ। একই সঙ্গে নানা প্রশ্নও উঠছে—আসলে কী হয়েছিল সেদিন?
‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলছিল সেখানে। ইউনিটের লোকজনের কথায়, সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। হঠাৎ করেই রাহুল সমুদ্রের জলে তলিয়ে যান। কেউ কেউ বলছেন, শুটিং প্রায় শেষের মুখেই এই ঘটনা ঘটে, আর সবার সামনেই তিনি ডুবে যান।
এই কঠিন সময়ে গণমাধ্যম ও সবার প্রতি আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। তিনি লেখেন, “এটি আমাদের জন্য গভীর শোক ও অসীম কষ্টের সময়। এই কঠিন মুহূর্তে আমরা আন্তরিকভাবে কিছুটা সময় ও ব্যক্তিগত পরিসর চাই।”
পরিবারের সবাই একসঙ্গে এই শোক সামলানোর চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি আরো লিখেন,“আমাদের পরিবারে একটি শিশু আছে, একজন মা আছেন—আছে প্রিয়জনেরা। আমরা সবাই মিলে এই অপূরণীয় ক্ষতি সামলানোর চেষ্টা করছি।”
গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে প্রিয়াঙ্কা বলেন, “আমাদের বন্ধু ও সহকর্মীদের কাছে বিনীত অনুরোধ— দয়া করে আমাদের এই ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান করুন। আমাদের শান্তভাবে শোক পালনের সুযোগ দিন।”
পরিচালক শুভাশিস মণ্ডলের কথায়, আগের দিনও একই জায়গায় শুটিং হয়েছিল। একটি দৃশ্যে রাহুল আর সহ-অভিনেত্রী শ্বেতাকে অল্প জলে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে দেখা যায়। দু’জনেই জলের মধ্যে খেলতে খেলতে দৃশ্যটা করছিলেন, ক্যামেরা চলছিল পেছন থেকে। সেই সময় রাহুল শ্বেতার হাত ধরে একটু একটু করে ভেতরের দিকে এগোতে থাকেন।
কিন্তু হঠাৎই পরিস্থিতি বদলে যায়। হাঁটুসমান জল পেরিয়ে যাওয়ার পর রাহুল ভারসাম্য রাখতে পারেননি। ইউনিট থেকে তখন চিৎকার করে তাঁকে থামতে বলা হয়, কিন্তু ততক্ষণে জল অনেকটাই বেড়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি হাবুডুবু খেতে শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ছুটে গিয়ে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জলের নিচে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছে, অনেকটা জল গিলে ফেলেছিলেন তিনি।
পরে আশপাশের নৌকা থেকে দড়ি ফেলে এবং ইউনিটের সাহায্যে তাঁকে তুলে আনা হয়। তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল বলে জানা গেছে। দ্রুত তাঁকে দিঘা মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচাতে পারেননি।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে টালিউডে কাজ করেছেন রাহুল। ছোটপর্দা, বড়পর্দা, ওয়েব—সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিকেও তাঁর অভিনয় দর্শকদের ভালো লেগেছিল। ‘ঠাকুমার ঝুলি’ সিরিজেও তিনি নজর কেড়েছিলেন।
১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর জন্ম তাঁর। অভিনয়ের শুরু থিয়েটার দিয়ে, আর সেখানেই তিনি শত শত নাটকে কাজ করেছেন। পরে বড়পর্দায় ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি বাড়ে। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে তিনি নিজের জায়গা পাকা করে নেন।
তবে তাঁর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি এখনও। শুটিং চলছিল, না কি কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল—তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। শ্বেতার দাবি, তিনিও জলে পড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তাহলে রাহুলের ক্ষেত্রে কেন এমন হল? এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে সবার মুখে।
ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই ইতিমধ্যেই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন। পুরনো সহকর্মী সুদীপ্তা চক্রবর্তীও এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চান। শুটিং স্পটে কীভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটল, তা পরিষ্কারভাবে জানার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। পাশাপাশি শিল্পী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

Social Plugin