মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে চলা সামরিক অভিযান আর বেশি দিন টানতে চান না। তাঁর কথায়, দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযান গুটিয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন, যুদ্ধ থামাতে আলাদা করে কোনো চুক্তির দরকার নেই—যদি আমেরিকার লক্ষ্য পূরণ হয়ে যায়, তাহলেই তারা সরে আসবে।
মঙ্গলবার এক অনুষ্ঠানে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানে মার্কিন বাহিনীর অভিযান “খুব শিগগিরই” শেষ হতে পারে। সময়সীমা নিয়ে তিনি বলেন, বড়জোর দুই সপ্তাহ, হয়তো তার থেকে দু-এক দিন বেশি। তাঁর দাবি, এই সময়ের মধ্যেই ইরান কার্যত ভেঙে পড়বে।
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, প্রভাব পড়েছে আমেরিকার ঘরোয়া বাজারেও। যদিও হোয়াইট হাউসে এ নিয়ে সরাসরি কিছু বলা হয়নি, তবু বিভিন্ন মহল থেকে প্রেসিডেন্টকে এই চাপের কথা জানানো হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই প্রশ্নের মুখে পড়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা খুব তাড়াতাড়ি ইরান থেকে বেরিয়ে আসব। ওরা শেষ হয়ে যাবে।”
তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন, এই অভিযান থামানো বা চালিয়ে যাওয়া—কোনোটাই ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতার ওপর নির্ভর করছে না। তাঁর ভাষায়, “যখন আমরা নিশ্চিত হব যে ওদের এতটাই পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তারা আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না, তখনই আমরা সরে আসব।” অর্থাৎ, চুক্তি হোক বা না হোক, আমেরিকা নিজের লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রশাসনের ভেতর থেকেও ইঙ্গিত মিলছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষে জড়াতে অনাগ্রহী ট্রাম্প দ্রুত কোনো সমাধানের পথ খুঁজছেন। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের মতো বড় কৌশলগত ইস্যুর চেয়ে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান পিট হেগসেথও ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধের শেষ পর্যায় খুব দূরে নয়।
একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর ওপরেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সরাসরি যোগ না দেওয়ায় তিনি অসন্তোষ দেখিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “নিজেদের জন্য লড়াই করতে শিখুন। আমেরিকা সব সময় পাশে থাকবে না।” এমনকি তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, কঠিন কাজ প্রায় শেষ, এখন যার যার তেল নিজেরাই জোগাড় করে নিক।
এই মন্তব্য এমন এক সময় এল, যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার কারণে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস যাতায়াত করে, ফলে সেখানে অস্থিরতা মানেই আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ। ইতিমধ্যে আমেরিকায় জ্বালানির দামও বেড়ে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প আরও কড়া ভাষায় বলেন, যারা এই অভিযানে অংশ নিতে রাজি নয়, তারা হয় আমেরিকা থেকে জ্বালানি কিনুক, নয়তো সরাসরি যুদ্ধে নামুক। এতে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানিয়েছে, তারা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেই আছে। একইভাবে ফ্রান্সের দিকেও আঙুল তুলেছেন ট্রাম্প, বিশেষ করে সামরিক বিমান চলাচলে বাধা দেওয়ার অভিযোগে। তবে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর-এর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, তারা শুরু থেকেই নিজেদের অবস্থানে অনড় এবং সেই সিদ্ধান্ত আগেই স্পষ্ট করা হয়েছিল।
এদিকে বিশ্লেষক পারসি মনে করছেন, ট্রাম্প আসলে এই পুরো পরিস্থিতিকে এমনভাবে তুলে ধরতে চাইছেন যেন আমেরিকা ইতিমধ্যেই বড় সাফল্য পেয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতেই, এবং তারা সেখানে চাপ বজায় রাখবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে যুদ্ধ থামানোর ইঙ্গিত যেমন আছে, তেমনই কৌশলগত অনিশ্চয়তাও রয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, কথার সঙ্গে বাস্তব কতটা মেলে।

Social Plugin