এরকম নয় যে এই প্রথম ভোটার তালিকায় সংশোধন হচ্ছে। এর আগেও হয়েছে। এবার ব্যতিক্রমী কেন? এবারই প্রথম এসআইআর শুরুর অনেক আগে থেকেই শোরগোল ফেলা হয়েছিল 'বহিরাগত' 'রোহিঙ্গা' 'ঘুসপেঠিয়া' এইসব বলে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন একটা বেঞ্চমার্ক তৈরি করে। 2002 সালের ভোটার লিস্টে নাম থাকতে হবে। আর যাদের সেসময় ভোটার লিস্টে নাম তোলার বয়স হয়নি তারা বাবা-মায়ের বা দাদু-ঠাকুমার সঙ্গে লিঙ্ক দেখিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারবেন। এইটুকু জেনে মনে হতেই পারে বিষয়টা বিশেষ জটিল নয়। এবার আসি আসল কথায়। যিনি দাদু বা ঠাকুমার সঙ্গে লিঙ্ক দেখিয়েছেন তাকে এমন সরকারি কাগজ দেখাতে হবে যেখানে তার সঙ্গে ঠাকুমার লিঙ্ক রয়েছে। যা দেখানো একপ্রকার অসম্ভব। আর যাদের ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই। তাদের কমিশন নির্দিষ্ট একটি কাগজ দেখাতে হবে ৷ নিন্মবিত্তের কাছে সেকাগজ নেই। তারা প্রথমত নিরক্ষর আর কাগজপত্রের ব্যাপারে তাদের কোনও ধরনাই নেই। ফলে অনেকেই কমিশন নির্দিষ্ট একটি কাগজও দেখাতে পারেনি। অনেকের কাছে জমির দলিল আছে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে কিন্তু তা গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি পঞ্চায়েত থেকে দেওয়া বার্থ সার্টিফিকেটকে মান্যতা দেওয়া হয়নি। প্রথমত কমিশন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিধি প্রয়োগ করেছে। এবার রাজ্যের এসআইআর মূল বিষয়ে আসা যাক। ২০০২-এর তালিকার সঙ্গে ম্যাপিং। এনুমুরেশন ফর্ম পূরণ ইত্যাদি পর্ব পেরিয়ে খসড়া তালিকা। যে তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় থাকা ভোটারের নাম বাদ। পশ্চিমবঙ্গে খসড়া তালিকায় বাদ ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮ জনের নাম। যার মধ্যে নিখোঁজ ১২ লক্ষ ২০ হাজার ৩৮ জন। মৃত ভোটার ২৪ লক্ষ ১৬ হাজার ৮৫২। অনুপস্থিত ১৯ লক্ষ ৮৮ হাজার ৩৮ এবং ডুপ্লিকেট ভোটার ১ লক্ষ ৩৮ হাজার। সঠিক কাজ। ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করতে গেলে এগুলো করতেই হবে। স্বভাবতই এসব নিয়ে কোনও আপত্তি ছিলনা। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গেই এলো লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি। প্রায় দেড় কোটি ভোটারের তথ্যগত অসঙ্গতি। যা খসড়া তালিকায় থাকা মোট ভোটারের প্রায় ১৮ শতাংশ। খেলাাটা এখানেই শুরু হল। এ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা বিভিন্ন সভায় রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গার যে সংখ্যা বলেন সারা পৃথিবীতে অত রোহিঙ্গা জনসংখ্যা নেই। ভারত সরকারের অনুমান এ দেশে ৪০ হাজারের কাছাকাছি রোহিঙ্গা আছে। আর তাদের মাতৃভাষাও রোহিঙ্গা বা রোয়াইঙ্গা, বাংলা নয়। যে ভাষা চট্টগ্রামের কথ্য ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। রোহিঙ্গারা তাদের কথায় রাখাইন এবং বার্মিজ শব্দ ব্যবহার করেন। তবুও অনেকেই এই ন্যারেটিভে বিশ্বাস করেছে। বিহারের এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হবার পরে কতজন 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' ধরা পড়লো নির্বাচন কমিশন তা বলতে পারেনি।
আসলে আগেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, ঘুসপেঠিয়া বলে এমন আতঙ্কের আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল যে ভোটাররা নিজেরাই নিজেদের অপরাধী ভাবতে শুরু করলেন। আতঙ্কিত নাগরিকরা তালিকায় নাম হারানোর ভয়ে দৌড়োদৌড়ি শুরু করলেন এ দরজা থেকে ও দরজায়। এই তালিকায় এরকম বহু মানুষ আছেন যারা বংশানুক্রমে এদেশে বসবাস করছেন। তাদের কারোর বয়স হয়তো ৮০ বা তার বেশি। কারোর ৬০, কেউবা ৫০-এর নিচে। এর আগে বেশ কয়েকবার ভোট দিয়েছেন। ২০০২-এ নাম ছিল। অথচ নতুন করে পরিচয় আর ভোট দেওয়ার অধিকার প্রমাণ করার জন্য তাদেরই গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হল। এই হেনস্তার দায় কার সে প্রশ্ন ওঠা কি খুবই অসঙ্গত?

Social Plugin