সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ, বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী দিল্লিতে

ভারতের সঙ্গে আগের মতো স্বাভাবিক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগের যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ ছিল, সেটায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাটা এখন পরিষ্কার। অনেক দিন ধরেই একটা ধারণা প্রচলিত—আওয়ামী লীগ মানেই ভারতের ঘনিষ্ঠ, আর বিএনপির সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক সবসময়ই জটিল। নতুন সরকার সেই ধারণাটাকেই ভুল প্রমাণ করতে চাইছে।

ক্ষমতায় আসার দু’মাসের মধ্যেই তাই ঢাকা চাইছে, দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে গুছিয়ে নিতে। সেই লক্ষ্যেই প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিদেশমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর। মঙ্গলবারই তিনি দিল্লিতে পৌঁছানোর কথা।

এই সফরের শুরুতেই তার বৈঠক হবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে। দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা গত কয়েক বছরে বেশ মজবুত ছিল—বিশেষ করে শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ থেকে জঙ্গি কার্যকলাপ অনেকটাই কমেছে বলে ভারতের দাবি। দিল্লি চাইবে, নতুন সরকারও যেন সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।

বাংলাদেশে আবারও হামের দাপট বাড়ছে, আর তার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক। গত তিন সপ্তাহেই হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহে প্রায় ৯৮টি শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই হঠাৎ বেড়ে যাওয়া মৃত্যুর সংখ্যা সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের আগে টিকা দেওয়ার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হিসাব বলছে, এখন পর্যন্ত ছয় হাজারেরও বেশি শিশুর মধ্যে হামের মতো উপসর্গ দেখা গেছে। সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬,৪৭৬। আগের বছরগুলোর তুলনায় এই বৃদ্ধিটা বেশ চোখে পড়ার মতো—সংক্রমণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে মৃত্যুও। তবে নিশ্চিত হিসাব আর সন্দেহভাজন সংখ্যার মধ্যে একটা ফারাক আছে। পরীক্ষাগারে এখন পর্যন্ত ৮২৬ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে, আর নিশ্চিত মৃত্যু ধরা হয়েছে ১৬টি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আসল চিত্রটা এর চেয়ে আরও গুরুতর হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষা করার আগেই রোগীর মৃত্যু হচ্ছে, ফলে তারা সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

তবে আলোচনায় শুধু সহযোগিতার বিষয়ই থাকবে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়েও কথা উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার খলিলুর রহমানের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক রয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়েল এবং পেট্রলিয়ামমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর সঙ্গে আলাদা করে বসবেন তিনি। আর সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সঙ্গে বৈঠকটি। সেখানে দুই দেশের একাধিক ঝুলে থাকা চুক্তি নতুন করে চালু করার বিষয়টি সামনে আসবে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ফরাক্কায় গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ডিসেম্বরেই। সেটি কীভাবে নবায়ন করা যায়, তা নিয়েই মূলত আলোচনা হবে। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়েও বাংলাদেশের আগ্রহ আছে, তবে আপাতত সে বিষয়ে দিল্লি খুব দ্রুত এগোচ্ছে না।

সব মিলিয়ে ভারত এবার একটু হিসেব করেই এগোতে চাইছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইচ্ছা থাকলেও, খুব দ্রুত বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না তারা। কারণ, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ যদি কমে না, তাহলে দিল্লিকেও তার জবাব দিতে হতে পারে। তাই আপাতত ধীরে, সতর্কভাবেই এগোনোর পথেই হাঁটছে ভারত।