ভোটের মুখে রাজ্যে একের পর এক আধিকারিক বদলি নিয়ে চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন। নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে কার্যত ব্যাখ্যায় নামতে হল তাদের। কমিশনের দাবি, গোটা প্রক্রিয়াটাই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য। সেই যুক্তি দেখিয়েই গত ১৭ দিনে ভোটমুখী পাঁচ রাজ্যে মোট ৫০৬ জন আধিকারিককে সরানো হয়েছে। তবে সংখ্যাটা খতিয়ে দেখলে চোখে পড়ে অন্য ছবি—এর মধ্যে একাই বাংলার আধিকারিক ৪৮৩ জন।
এই ব্যাপক রদবদল নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখে আপত্তি জানিয়েছেন। তার জবাবেই শুক্রবার কমিশনের তরফে বলা হয়, ভোট ঘোষণার আগেই রাজ্য সরকার নাকি বড়সড় বদলির পথে হেঁটেছিল। কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, এসআইআর শুরুর আগে থেকে ভোট ঘোষণা পর্যন্ত রাজ্যে ১৩৭০ জন আধিকারিককে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন ৯৭ জন আমলা, ১৪৬ জন শীর্ষপদে থাকা পুলিশকর্তা এবং আরও ১১২৭ জন প্রশাসনিক আধিকারিক। কমিশনের বক্তব্য, গোটা পরিস্থিতির জটিলতা তৈরি হয়েছিল তখনই, আর তারা পরে সেই অবস্থাই ঠিক করার চেষ্টা করেছে।
রাজ্যে ব্যাপক সংখ্যায় আধিকারিক বদলি নিয়ে মুখরক্ষার মরিয়া চেষ্টা কমিশনের! তাদের লক্ষ্য স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। সেই লক্ষ্য পূরণে গত ১৭ দিনে ভোটমুখী পাঁচ রাজ্যের মোট ৫০৬ জন আধিকারিককে বদলি করেছে নির্বাচন কমিশন।
তবে এই ব্যাখ্যায় সবাই সন্তুষ্ট নন। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, কমিশন এখন চাপ সামলাতেই এই যুক্তি দিচ্ছে। কারণ, ভোটের আগে দীর্ঘদিন এক জায়গায় থাকা আধিকারিকদের সরানোর নিয়ম কমিশনেরই। সেই নিয়ম মেনেই রাজ্য সরকার বদলি করেছিল বলেই মত অনেকের। ফলে কমিশনের এই অবস্থানকে অনেকেই ‘মুখরক্ষার চেষ্টা’ হিসেবেই দেখছেন।
এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি দেখাচ্ছে কমিশন। শাসক দলের হয়ে প্রচার করার অভিযোগে খণ্ডঘোষের জয়েন্ট বিডিওকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
শাসক শিবিরের অভিযোগ আরও সরাসরি। তাদের দাবি, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে যেখানে মোটে ১৫ জন আধিকারিককে সরানো হয়েছিল, সেখানে এবার ভোট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যেভাবে একের পর এক বদলির নির্দেশ আসছে, তা অস্বাভাবিক। তাদের কথায়, এই পুরো প্রক্রিয়ার পিছনে বিজেপির প্রভাব স্পষ্ট।
ঘটনাপ্রবাহও সেই প্রশ্নই তুলছে বলে দাবি তাদের। ১৫ মার্চ ভোট ঘোষণার রাতেই মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিবকে সরানো হয়। পরদিন রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতা পুলিশের কমিশনারসহ ৭৯ জন আধিকারিককে বদলি করা হয়। ১৭ ও ১৮ মার্চ আরও ৩৮ জন আইপিএস এবং ১৩ জন আইএএস আধিকারিককে সরানো হয়। এরপর ২৩ ও ২৯ মার্চ ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে বদলি করা হয়। পাশাপাশি ৮৩ জন বিডিও, অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার এবং ১৮৪ জন থানার আইসি-ওসিকেও সরানো হয়েছে। এমনকি ১৩ জন আইপিএস আধিকারিককে অন্য রাজ্যে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
এই পুরো পরিস্থিতি নিয়েই আগেই নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে কড়া ভাষায় আপত্তি জানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই ধরনের পদক্ষেপ একেবারেই নজিরবিহীন এবং ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সামিল। সেই অভিযোগের জবাব দিতেই এবার কমিশনের তরফে এই বিস্তারিত ব্যাখ্যা সামনে এল।

Social Plugin