প্রয়োজনে সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করতে পারে সুপ্রিম কোর্ট

প্রয়োজনে সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করতে পারে সুপ্রিম কোর্ট—পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সোমবার এমনই ইঙ্গিত মিলেছে। এই অনুচ্ছেদ আসলে সর্বোচ্চ আদালতের এক বিশেষ ক্ষমতা, যার জোরে তারা কোনো মামলায় ‘সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে।

এদিন আদালত পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগও জানায়। একই সঙ্গে বলে, নির্বাচনের চাপে পড়ে যেন এই প্রক্রিয়া এলোমেলো বা তাড়াহুড়ো করে না করা হয়।

প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির বেঞ্চ একটি রিট আবেদনের শুনানি করছিল। আবেদনটি করেছিলেন এমন কিছু ভোটার, যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং যাদের আপিল এখন ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার সময়সীমা একটু বাড়ানো হোক। কারণ, আপিলে তারা জিতলে ভোট দেওয়ার সুযোগ তো তাদের পাওয়া উচিত।

এই বিতর্কের মধ্যে উঠে এসেছে মুহাম্মদ দাউদ আলীর ঘটনাও। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রাক্তন এই টেকনিশিয়ান হঠাৎই জানতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় তার নাম নেই। শুধু তাই নয়, তার তিন সন্তানের নামও কেটে দেওয়া হয়েছে। অথচ পাসপোর্ট থেকে চাকরির কাগজ—সব বৈধ নথিই তার আছে। তালিকায় রয়ে গেছে শুধু তার স্ত্রীর নাম।

এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় রাজ্যের প্রায় ৭ কোটি ৬০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৯২ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে, যা মোটের ওপর প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশি ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ হিসেবে চিহ্নিত, আর প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের বিষয় এখনো ঝুলে আছে—যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ট্রাইব্যুনাল।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই ধরনের তালিকা সংশোধন হয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বাড়তি একটি ধাপ যোগ হয়েছে—যেখানে বিচারিকভাবে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, উদ্দেশ্য একটাই—ভোটার তালিকা পরিষ্কার রাখা, যাতে নকল বা অযোগ্য নাম না থাকে। কিন্তু বিহারে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, আর পশ্চিমবঙ্গে এসে তা আরও তীব্র হয়েছে।

এখানে বিষয়টা শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকও। রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস আর নির্বাচন কমিশনের মধ্যে টানাপোড়েন চরমে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কথায়, তারা একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে চান। কিন্তু বিরোধীরা বলছে, এই প্রক্রিয়ার আড়ালে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে টার্গেট করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কিছু বক্তব্যেও সেই ইঙ্গিত মিলেছে বলে অভিযোগ। নির্বাচনী সভায় ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে—যা তৃণমূলের মতে আসলে মুসলিমদের দিকেই ইঙ্গিত করে। যদিও বাস্তবে তালিকা থেকে বাদ পড়াদের মধ্যে অনেক হিন্দুও রয়েছেন।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দীর্ঘ, আর তার বড় অংশই অরক্ষিত বা নদীবেষ্টিত। পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে এই সীমান্তের বড় অংশ যাওয়ায় অভিবাসন ইস্যু এখানে বরাবরই স্পর্শকাতর। তার প্রভাব ভোটার তালিকার বিতর্কেও পড়েছে।

জনসংখ্যার দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম। অথচ তালিকা থেকে বাদ পড়া ৯০ লক্ষের মধ্যে প্রায় ৩১ লক্ষই মুসলিম—এই অনুপাত অনেকেরই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

২০১১ সাল থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস এখানে ক্ষমতায়। বিজেপি প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, আর এই রাজ্য তাদের কাছে অনেক দিনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য। ২০২১ সালের নির্বাচনে তারা কিছুটা এগোলেও ক্ষমতায় আসতে পারেনি।

তৃণমূলের অভিযোগ, এই সংশোধন প্রক্রিয়া আসলে বিজেপির সুবিধার জন্যই করা হচ্ছে, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ—বিশেষ করে মুসলিমরা—ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হন। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে।

বারবার আইনি চ্যালেঞ্জের পর সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে, যদিও সব আপত্তির নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। ফলে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে।

এই মানুষগুলোই এখন পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে। তাদের জমা দেওয়া ফর্মে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে মিল দেখানো হয়েছিল, যেটাকে অনেকেই শেষ ‘পরিষ্কার’ তালিকা বলে মনে করেন। কিন্তু নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর পদ্ধতিতে তাদের নথিতে অসঙ্গতি দেখিয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব বলছে, এই অনিশ্চিত তালিকার প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলিম। ফলে বিষয়টা আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কথায়, “এভাবে ভোটাধিকার ঝুলিয়ে রেখে নির্বাচন করা—ভারতে এমন নজির নেই।” তার মতে, এত বড় সংখ্যক মানুষকে বাদ দেওয়া একেবারেই অযৌক্তিক এবং গণতন্ত্রের জন্য লজ্জার।

অন্যদিকে বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার বলছেন, দেশের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল। তার যুক্তি, সংবিধান অনুযায়ী কেবল নাগরিকরাই ভোট দিতে পারবেন, তাই তালিকা থেকে অযোগ্যদের বাদ দেওয়া প্রয়োজন।

তবে ২৭ লক্ষ মানুষের অবস্থান এখনো অনিশ্চিত—এই অবস্থায় নির্বাচন হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি দায় চাপান রাজ্য সরকারের ওপর। তার দাবি, বিষয়টি আদালতে নিয়ে যাওয়াতেই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে গেছে।

এরই মধ্যে পুরো নির্বাচনী প্রচারে এই ইস্যুই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়ে উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনসভায় ঘোষণা করেছেন, তিনি আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন। তার প্রশ্ন, “এত মানুষের সমস্যা মেটানো ছাড়া কীভাবে ভোট শুরু হয়?”

আদালত জানিয়েছে, এই মামলার শুনানি ১৩ এপ্রিল হবে। কিন্তু তাতে সমাধান কতটা মিলবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টা এসে ঠেকছে এক জায়গাতেই—ভোটাধিকার। অনেকের কাছে এটা শুধু ভোট দেওয়া নয়, নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার একমাত্র পথ। সুন্দরবনের এক ভোটারের কথা মনে পড়ে যায়—তিনি বলেছিলেন, “আমরা যদি ভোটই না দিতে পারি, তাহলে গরিব মানুষের কথা মনে রাখবে কে?”