ইরান শীঘ্রই আলোচনা শুরুর কথা জানানোর মধ্যেই ট্রাম্পের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা

মঙ্গলবার একেবারে শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নেয় পরিস্থিতি। ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার যে সময়সীমা ডোনাল্ড ট্রাম্প বেঁধে দিয়েছিলেন, সেটার মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরান—দু’পক্ষই দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধ থামাতে রাজি হয়। এর অংশ হিসেবে তেহরানও হরমুজ প্রণালী কিছু সময়ের জন্য খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

হোয়াইট হাউসের তরফে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তে ইসরায়েলও সম্মতি দিয়েছে। ট্রাম্প যখন জানালেন যে আপাতত ইরানজুড়ে হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হচ্ছে, তখনই তিনি আরেকটি বিষয়ও সামনে আনেন। তার কথায়, ইরান তাদের কাছে ১০ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যেটাকে তিনি আলোচনার জন্য বাস্তবসম্মত ভিত্তি হিসেবে দেখছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে এই সময়টায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।

বুধবার সকালেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে হঠাৎ বড়সড় ধাক্কা দেখা গেল। লেনদেন শুরু হতেই দাম এক লাফে নেমে আসে। ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় ১৩.৬ শতাংশ পড়ে এখন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৪.৪৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আর মার্কিন ডব্লিউটিআই ক্রডের দামও ১৪ শতাংশের বেশি কমে গিয়ে প্রায় ৯৬.৮২ ডলারের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এই পতনের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে—ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা। যুদ্ধবিরতির খবর বাজারে ছড়াতেই তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে, যা অনেক দিন পর দেখা গেল। শুধু তেলই নয়, এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। জাপান থেকে দক্ষিণ কোরিয়া—বেশিরভাগ এশীয় বাজারেই ইতিবাচক সুর। এখন নজর ভারতের দিকে, এখানকার বাজারও একইভাবে চাঙা হবে কি না, সেটাই দেখার।

এই ঘোষণার পেছনে কূটনৈতিক চাপও ছিল। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আগে থেকেই ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন সময়সীমা বাড়াতে এবং ইরানকে প্রণালী খুলে দেওয়ার ব্যাপারে রাজি করাতে।

এদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, ট্রাম্প যে দুই সপ্তাহের বিরতির কথা বলেছেন, সেটাকে তারা সমর্থন করছে। তবে তাদের বক্তব্য পরিষ্কার—এই যুদ্ধবিরতির মধ্যে লেবাননের পরিস্থিতি ধরা হচ্ছে না।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন কিছুটা পিছু হটেছেন। যদিও শর্ত একটাই—ইরানকে যুদ্ধবিরতি মানতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে হবে।

এর মধ্যেই ইরান একটি ১০ দফার প্রস্তাবও সামনে এনেছে, যেটাকে তারা সংঘাত শেষ করার ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়। তাদের দাবি, এই প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না হলে স্থায়ী কোনো সমাধান সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই প্রস্তাবের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো আগে যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে চায়নি। যেমন—

  • ইরানের ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া

  • হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা

  • মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়া

  • ইরান ও তার মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ করা

  • জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া

  • যেকোনো চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনও সংবেদনশীল, তবে আপাতত দু’পক্ষই কিছুটা থামার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই দুই সপ্তাহের বিরতি আসলে বড় কোনো সমাধানের দিকে এগোয় কি না।