চুক্তি মেনে চলতে তেহরান ব্যর্থ হলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের

ইরানকে ঘিরে আবারও কড়া বার্তা দিলেন ট্রাম্প। একই সময় আলোচনার পথ খোলা রাখতেই আজ পাকিস্তানে পৌঁছানোর কথা তেহরানের একটি প্রতিনিধিদলের।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চলাকালীন লেবাননে নিজেদের হামলা কিছুটা কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে ইসরায়েল। অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান—দু’জনকেই আহ্বান জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির চুক্তির আওতায় লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে।

এদিনই ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ ও বিমান ইরান এবং আশপাশের অঞ্চলে আগের মতোই মোতায়েন থাকবে। তার ভাষায়, তেহরান যদি চুক্তির শর্ত পুরোপুরি না মানে, তাহলে ওয়াশিংটন আবার হামলা শুরু করতে পিছপা হবে না। নিজের সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে তিনি লেখেন, সব ধরনের অস্ত্রসজ্জাসহ মার্কিন বাহিনী ওই অঞ্চলে অবস্থান চালিয়ে যাবে, যতক্ষণ না চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত হচ্ছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর খুব বেশি সময় পেরোয়নি, তার মধ্যেই লেবাননের আকাশে আবারও যুদ্ধের আগুন। কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই বৈরুতের একের পর এক জনবহুল এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল।শহরের বাণিজ্যিক এলাকা থেকে শুরু করে আবাসিক পাড়া—কোথাও রেহাই মেলেনি। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো বৈরুত। মুহূর্তের মধ্যে স্বাভাবিক জীবন থেমে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক আর ধোঁয়া। হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় স্থানীয় হাসপাতালগুলো প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায়। রোগীতে উপচে পড়ছে ওয়ার্ড, করিডর, এমনকি জরুরি বিভাগের সামনের জায়গাগুলোও। চিকিৎসক আর নার্সদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে সাহায্যের আহ্বান জানানো হচ্ছে। অনেক এলাকা এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ। ঘরবাড়ি হারিয়ে অসংখ্য মানুষ রাস্তায়, কারও কাছে নেই কোনো স্পষ্ট গন্তব্য। কোথায় যাবে, কীভাবে বাঁচবে—এই প্রশ্নই এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। উদ্ধারকর্মীরা রাতভর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে একের পর এক আহত ও নিহত মানুষকে বের করে আনা হচ্ছে। সময় যত যাচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির গভীরতা। এই অবস্থায় হিজবুল্লাহ বলছে, যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ছিল। তাদের অভিযোগ, ইসরায়েলের এই হামলা শুধু প্রাণহানিই বাড়াচ্ছে না, পুরো চুক্তিটাকেই ভেঙে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এদিকে লেবানন ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছেই। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে তারা ইসরায়েলের দিকে রকেট ছুড়েছে। গত মাসে সংঘাত শুরু হওয়ার পর বুধবার লেবাননে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালায় ইসরায়েল—যেখানে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যায়। এর আগে স্বল্প সময়ের বিরতির পরই আবার উত্তরের দিকে রকেট হামলা শুরু করেছিল হিজবুল্লাহ।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তেহরান কঠোর প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী নিয়ে টানাপোড়েনও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে—খোলা হবে কি হবে না, তা নিয়ে দোলাচল চলছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সুর চড়িয়েছেন। টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, যেকোনো সময় আবার পূর্ণমাত্রার লড়াই শুরু করতে প্রস্তুত তাদের বাহিনী। তার কথায়, “আমাদের আঙুল ট্রিগারের ওপরই আছে।”

ইরান অবশ্য বরাবরের মতোই দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। যদিও তারা ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ কম নয়—কারণ এখান থেকে অস্ত্র তৈরির উপযোগী পর্যায়ে পৌঁছাতে আর খুব বেশি কিছু লাগে না।

ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে মিলে এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলতে কাজ করবে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এ নিয়ে স্পষ্ট কিছু এখনো শোনা যায়নি।

এদিকে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার পথ বন্ধ হচ্ছে না। ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। স্থানীয় সময় শনিবার সকালে প্রথম দফার বৈঠক হওয়ার কথা।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ টানটান। একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে মাঝেমধ্যেই নতুন করে সংঘাতের ইঙ্গিত—এই দুইয়ের মাঝখানেই এগোচ্ছে কূটনৈতিক তৎপরতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দু’পক্ষই আপাতত নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। তবে আলোচনার টেবিলই এখন একমাত্র ভরসা।