২২ বছরের অপেক্ষার অবসান, লাল-হলুদের উৎসবে ভাসল ময়দান: আবেগ, উচ্ছ্বাস আর গর্বে স্মরণীয় এক সন্ধ্যা

কেউ কোলে করে নিয়ে এসেছেন সাত মাসের মেয়েকে। ছোট্ট শিশুটির গায়েও লাল-হলুদের জার্সি। চারপাশে হাজার হাজার মানুষের উচ্ছ্বাস, ঢাকের শব্দ, স্লোগান— কিছুই সে এখনও বুঝতে পারে না। তবু বাবা চান, একদিন বড় হয়ে মেয়েটি বলতে পারুক, ‘সেদিন আমিও ছিলাম।’ আবার ৭৮ বছরের দীপালি দাস নাতি অতূনের হাত ধরে হাজির হয়েছেন ক্লাবে। বয়সের ভারে হাঁটা এখন আর সহজ নয়, কিন্তু এমন একটা দিন কি মিস করা যায়?

২২ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। সেই আনন্দ ভাগ করে নিতে শুক্রবার দুপুর থেকেই লেসলি ক্লডিয়াস সরণিতে নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। শুধু সমর্থক নয়, যেন এক আবেগের মিছিল। কারও গায়ে প্রিয় ক্লাবের জার্সি, কারও মুখে লাল-হলুদ আবির, কারও হাতে পতাকা। প্রত্যেকের চোখেমুখে একটাই অনুভূতি— গর্ব।

বিকেলের দিকে বহু প্রতীক্ষিত আইএসএল ট্রফি মাঠে পৌঁছতেই যেন আবেগের বাঁধ ভেঙে যায়। ‘জয় ইস্ট বেঙ্গল’ ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে গোটা ময়দান। সেই শব্দে ছিল অপেক্ষার যন্ত্রণা, স্বপ্নপূরণের আনন্দ আর অগণিত সমর্থকের ভালোবাসা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ক্লাব প্রাঙ্গণে পতাকা উত্তোলন করেন কোচ অস্কার। তারপর একে একে মাঠে আসেন ফুটবলাররা। মিগুয়েল, এডমুন্ড, শৌভিকদের দেখা মিলতেই উচ্ছ্বাস আরও বাড়ে। আর যখন সাউন্ড বক্সে ভেসে আসে স্প্যানিশ কোচ অস্কারের নাম, তখন গ্যালারির গর্জন যেন অন্য মাত্রা পায়।

ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবে, ক্লাবের শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার এবং লগ্নিকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা ফুটবলার ও কোচিং স্টাফদের গলায় মেডেল পরিয়ে দেন। তারপর আসে সেই মুহূর্ত, যার জন্য অপেক্ষা ছিল এত দিনের। অধিনায়ক শৌভিক ও তাঁর সতীর্থদের হাতে তুলে দেওয়া হয় আইএসএল ট্রফি।

তারপর আর আনন্দের লাগাম ছিল না। কেউ ট্রফি মাথার উপর তুলে ধরেছেন, কেউ নেচেছেন, কেউবা গ্যালারির দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। গোলরক্ষক গিল, এডমুন্ডদের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে মাঠ। তবে সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য তৈরি করেন কোচ অস্কার। সমর্থকদের দিকে এগিয়ে গিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে তিনি যেন জানিয়ে দিলেন, এই সাফল্য তাঁর একার নয়, সমর্থকদেরও।

কয়েক দিন আগেই মরশুম শেষে দল ছাড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। ফলে অনুষ্ঠান শেষে যখন তিনি মাঠ ছাড়তে যান, তখন তাঁর গাড়ি ঘিরে ধরেন অসংখ্য সমর্থক। একটাই আবেদন, ‘প্লিজ স্টে।’ সেই মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছিল, একজন কোচ কতটা গভীরভাবে জায়গা করে নিতে পারেন সমর্থকদের হৃদয়ে।

পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শৌভিক বলেন, অন্য দলের হয়ে আগে আইএসএল জিতলেও এই সাফল্যের অনুভূতি আলাদা। অন্যদিকে গোলরক্ষক গিলের কথায়, এটি তাঁর ফুটবল জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত।

ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে, মাঠ ফাঁকা হয়েছে, আলো নিভেছে। কিন্তু সমর্থকদের মুখে হতাশা নয়, ছিল তৃপ্তির হাসি। মাথা উঁচু করে তাঁরা ফিরেছেন ঘরে। কারণ এবার তাঁদের ক্লাব শুধু ২২ বছরের প্রতীক্ষাই শেষ করেনি, নতুন ইতিহাসও গড়েছে। পুরুষ ও মহিলা— দুই দলই চ্যাম্পিয়ন হয়ে এএফসি মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

লাল-হলুদের কাছে এটি শুধু একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি বিশ্বাসের জয়, অপেক্ষার জয়, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলা এক আবেগের জয়গান।