ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের আবহে এবার প্রকাশ্যে এল এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এর একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত বছর ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় পাকিস্তানকে সরাসরি প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছিল চীন। শুধু অস্ত্র সরবরাহ নয়, সংঘাত চলাকালীন চীনা কর্মীরাও পাকিস্তানের মাটিতে থেকে কাজ করেছেন বলেও প্রথমবারের মতো কার্যত স্বীকার করেছে বেইজিং।
ঘটনার সূত্রপাত ২২ এপ্রিল, জম্মু ও কাশ্মীরের পাহালগামে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর। সেই হামলায় প্রাণ হারান ২৬ জন। ঘটনার জেরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। পাল্টা জবাব হিসেবে ভারত শুরু করে ‘অপারেশন সিঁদুর’। পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালানো হয়। ভারতের দাবি, এই অভিযানে জইশ-ই-মহম্মদ, লস্কর-ই-তইবা ও হিজবুল মুজাহিদিনের সঙ্গে যুক্ত শতাধিক জঙ্গি নিহত হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটেই সামনে আসে চীনের ভূমিকার প্রসঙ্গ। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিতে সম্প্রচারিত একটি সাক্ষাৎকারে ‘এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন অফ চায়না’ বা এভিআইসি-র কয়েকজন প্রকৌশলী পাকিস্তানকে সহায়তা দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেন। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সংঘাত চলাকালীন পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে তারা সরাসরি মাঠে উপস্থিত ছিলেন।
এভিআইসি-র অধীনস্থ ‘চেংদু এয়ারক্রাফট ডিজাইন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর প্রকৌশলী ঝাং হেং জানান, সংঘাতের সময় তারা এমন পরিস্থিতিতে কাজ করেছেন যেখানে প্রায়ই যুদ্ধবিমানের গর্জন এবং হামলার সতর্ক সংকেত শোনা যেত। তাঁর কথায়, তীব্র গরম, মানসিক চাপ এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছিল। তবে সেই অভিজ্ঞতাকেই তিনি “অগ্নিপরীক্ষা” বলে উল্লেখ করেছেন।
ঝাং হেং আরও বলেন, পাকিস্তানে গিয়ে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সরঞ্জামগুলিকে বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজ করানো। বিশেষ করে চীনা তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল। তাঁর দাবি, এই যুদ্ধবিমান শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যের প্রতীক নয়, বরং চীন-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্কের গভীরতারও প্রমাণ।
একই প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মী শু দা যুদ্ধবিমানটিকে নিজের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর কথায়, দীর্ঘদিন ধরে যত্ন নিয়ে তৈরি করা একটি প্রযুক্তি যখন বাস্তব যুদ্ধে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করে, তখন সেটি নির্মাতাদের কাছে আলাদা অনুভূতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তিনি দাবি করেন, জে-১০সিই যে ফল দেখিয়েছে, তা তাদের কাছে মোটেও অপ্রত্যাশিত ছিল না।
জে-১০সিই মূলত চীনের অত্যাধুনিক জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। বর্তমানে পাকিস্তানই এই যুদ্ধবিমান ব্যবহারকারী একমাত্র বিদেশি দেশ। ২০২০ সালে ইসলামাবাদ ৩৬টি জে-১০সিই এবং ২৫০টি পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছিল।
ভারতীয় সেনাবাহিনী আগেই দাবি করেছিল, পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই চীনের তৈরি। সেনার ডেপুটি চিফ অফ আর্মি স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাহুল আর সিংয়ের বক্তব্য ছিল, চীন পাকিস্তানকে কার্যত নিজেদের অস্ত্র পরীক্ষার “জীবন্ত গবেষণাগার” হিসেবে ব্যবহার করছে। তাঁর মতে, শুধু অস্ত্র বিক্রি নয়, বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই অস্ত্র কতটা কার্যকর, সেটিও যাচাই করছে বেইজিং।
তিনি আরও বলেন, সংঘাতের সময় পাকিস্তান নাকি চীনের কাছ থেকে ভারতের সামরিক অবস্থান সংক্রান্ত ‘লাইভ আপডেট’ পাচ্ছিল। এমনকি তুরস্কও বিভিন্নভাবে পাকিস্তানকে সহায়তা করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ভারতের আরও শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন জরুরি।
বর্তমানে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান বহরের বড় অংশই চীনা প্রযুক্তিনির্ভর। যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার থেকে শুরু করে জে-১০সি, সব ক্ষেত্রেই চীনের উপস্থিতি স্পষ্ট। পাশাপাশি খবর, পাকিস্তান খুব শিগগিরই চীনের কাছ থেকে পঞ্চম প্রজন্মের ‘স্টেলথ’ যুদ্ধবিমান শেনইয়াং জে-৩৫ সংগ্রহ করতে পারে। তা হলে দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক রিপোর্টেও উঠে এসেছে, ভারত এখন চীনকেই তাদের প্রধান কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে। পাকিস্তানকে সেখানে তুলনামূলকভাবে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত

Social Plugin