ময়দানের ‘টুটুদা’কে শেষ প্রণাম: শোক, স্মৃতি আর রঙ মিলিয়ে বিদায় এক যুগের

সকালটা যেন অন্যরকম ছিল। মোহন বাগান ক্লাবের পতাকা অর্ধনমিত, চারদিকে এক অদ্ভুত শূন্যতা। তাঁবুর ভেতরে ভিড়, কিন্তু সেই ভিড়ে নেই চেনা কোলাহল—বরং আছে হারানোর কষ্ট, চোখের জলে ভেজা স্মৃতি। সবুজ লনের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফুলগুলোও যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছিল, একজন খুব আপন মানুষ আর নেই।

মঙ্গলবার গভীর রাতে চলে গেলেন স্বপন সাধন বসু, সবার প্রিয় টুটুবাবু। বয়স হয়েছিল ৭৮। কিন্তু ময়দানের কাছে বয়স কোনোদিনই তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারেনি—তিনি ছিলেন এক আবেগ, এক উপস্থিতি। বুধবার তাঁকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে জড়ো হয়েছিল ময়দান, আর সেই বিদায়ের রঙে মিশে গিয়েছিল গেরুয়া, সবুজ, লাল-হলুদ—সব পরিচয়, সব বিভাজন যেন মুহূর্তে গলে গিয়েছিল।

সকালেই হাসপাতাল থেকে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হয় বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে। সেখানে একে একে পৌঁছন পরিচিত মুখেরা—বিমান বসু, ফিরহাদ হাকিম, মুনমুন সেন, রাইমা সেন, স্বপন দাশগুপ্ত। প্রত্যেকের কথাতেই ফিরে আসছিল টুটুবাবুর স্মৃতি, তাঁর সহজাত মিশুক স্বভাব, আর ক্লাবের প্রতি তাঁর অদ্ভুত টান। মোহন বাগানেরই আর এক ঘরের ছেলে সুব্রত ভট্টাচার্যও এসে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

এরপর মরদেহ ঘুরে যায় বিভিন্ন জায়গায়—সংবাদ প্রতিদিনের দফতর, ভবানীপুর ক্লাব। সব জায়গাতেই ছিল মানুষের ঢল। শেষ পর্যন্ত বেলা গড়িয়ে যখন তাঁকে আনা হল মোহন বাগান ক্লাবে, তখন সময় প্রায় এগারোটা পনেরো। গঙ্গার ধারের সেই চেনা মাঠে ফিরলেন ‘টুটুদা’, তবে এবার শেষবারের মতো।

মোহন বাগানকে তিনি নিজের মতো করে গড়ে তুলেছিলেন। ক্লাবের ভেতরের আবহ, মানসিকতা—সবকিছুতে তাঁর আলাদা ছাপ ছিল। বড় ম্যাচের আগে তাঁর সেই চেনা উক্তি—“বাঙালদের পাঁচ গোল না দিলে শান্তি নেই”—আজও অনেকের কানে বাজে। সেই কথাতেই গ্যালারিতে আগুন জ্বলে উঠত। আজ সেই সবই স্মৃতি।

সময় যত এগিয়েছে, ভিড়ও তত বেড়েছে। প্রাক্তন ফুটবলার শ্যাম থাপা, সত্যজিৎ চ্যাটার্জি, শিশির ঘোষ, মানস ভট্টাচার্য, বিদেশ বসু, অমিত ভদ্র, শিলটন পাল—সবার কথাতেই উঠে এসেছে টুটুবাবুর সঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্ত।

রাজনীতির ময়দান থেকেও এসেছিলেন অনেকে। শুভেন্দু অধিকারী এসে ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন। পরে তিনি বলেন, “টুটুবাবু মানেই মোহন বাগান। উনি ক্লাবটাকে শুধু পরিচালনা করেননি, আগলে রেখেছিলেন। এখন দায়িত্ব সমর্থক আর সদস্যদের।”

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শোকপ্রকাশ করেন। ক্রীড়াজগতের বহু পরিচিত মুখ—নিশীথ প্রামাণিক, কল্যাণ চৌবে, সৌরভ গাঙ্গুলি, লক্ষ্মীরতন শুক্লা—এসেছিলেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার সীমা পেরিয়ে লাল-হলুদ শিবির থেকেও হাজির হয়েছিলেন দেবব্রত সরকার, বাবলু গাঙ্গুলি। মহমেডান স্পোর্টিংয়ের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। সামাজিক মাধ্যমে শোক জানিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়সহ আরও অনেকে।

দিনের শেষে, বিকেলের দিকে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ময়দান ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করলেও, কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়—যেখানে টুটুবাবু ছিলেন, থাকবেনও, স্মৃতির ভেতর দিয়ে।

ছবি: সংগৃহীত